Friday , December 4 2020
Breaking News
Home / Education / ইটের বিকল্প কনক্রিট ব্লক ব্যবসা!

ইটের বিকল্প কনক্রিট ব্লক ব্যবসা!

মানুষের আয় বৃদ্ধির ফলে দেশে ইটের বাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু ইট নির্মাণ হয় জমির উপরিভাগের মাটি দিয়ে, যেই মাটি ফসলের জন্য উর্বর। এছাড়া ইট নির্মাণে পোড়ানো হয় কাঠ। ফলে একদিকে অক্সিজেন উৎপাদক গাছ কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ইটের ভাটা থেকে বিষাক্ত কার্বন গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। এতে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। তাই পরিবেশ ও জলবায়ুর কথা বিবেচনা করে ২০২০ সালের মধ্যে সব ইটভাটা বন্ধের দাবি উঠেছে পরিবেষবাদীদের তরফ থেকে। তাহলে ঘর-বাড়ি নির্মাণের উপায়?

ইটের বিকল্প ও ব্যয় সাশ্রয়ী নির্মাণ উপকরণ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনিস্টিটিউট (এইচবিআরআই)। প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উঠে আসে ইটের বিকল্প কনক্রিটের ব্লকের কথা। এই ব্লক নির্মাণ করা হয় সিমেন্ট ও নুড়ি পাথর দিয়ে। ইটের মতো পোড়াতে হয় না। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের নির্মাণে ব্যবহার করছে ইটের বিকল্প কনক্রিট ব্লক। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো তো সেই ব্লক খোলা বাজারে বিক্রি করে না। তাহলে সাধারণ মানুষের কী হবে?

এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ি থানার বালিগাঁওয়ের ছেলে মোহাম্মাদ শাহাদাৎ হোসেন শিপু নির্মাণ করেছেন কনক্রিটের ব্লক তৈরির মেশিন বা ফর্মা। এই মেশিন দিয়ে একজন মানুষ দিনে খুব সহজেই ১০০টি ব্লক বানাতে পারে। প্রত্যেক ব্লকে খরচ পড়বে ৩০ টাকা। একটি ব্লক সাড়ে পাঁচটি ইটের সমান। সাড়ে পাঁচটা ইটের দাম যেখানে কমপক্ষে ৫৫ টাকা, সেখানে ৩০ টাকায় কাজ হয়ে যাচ্ছে।

শিপু জানালেন, ‘এই ব্লক ব্যবহার দামে তো সাশ্রয় হচ্ছেই মূল সাশ্রয় হয় অন্য জায়গায়। যেই বাড়িতে ইট লাগবে ১৫ হাজার, সেখানে ব্লক লাগবে ৩ হাজার। এখানে সিমেন্ট বালুও সাশ্রয় হবে। কমবে মিস্ত্রি খরচ, সময়ও লাগবে কম। এছাড়া এই ব্লকের মাঝখানে ফাঁকা থাকে বলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এসি ঘরের মতো। আর প্লাস্টার খরচও খুব কম। এছাড়া ইলেকট্রিক ওয়্যারিং করতেও কষ্ট কম হয়।’

সব মিলিয়ে কনক্রিটের ব্লক দিয়ে বাড়ি নির্মাণে ৩০ শতাংশের উপরে টাকা সাশ্রয় হয়। একটি বাড়ি নির্মাণে যদি এক লাখ টাকার ইট লাগে, সেটা কংক্রিটের ব্লক দিয়ে ৭০ হাজার টাকায় করা যাবে। বর্তমানে শিপু নিজে দুইটি ফর্মা বানিয়ে তা দিয়ে ব্লক তৈরি করছেন নিজের ঘরের জন্য। নিজের ঘর তৈরি হয়ে গেলে বাণিজ্যিকভাবে ব্লক তৈরি করবেন, এবং তার এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেবেন দেশের নানা প্রান্তে।

চ্যানেল আই অনলাইনকে শাহাদাৎ হোসেন শিপু বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলের মানুষ এখনও খুব একটা জানে না। পদ্ধতিটাকে পরিচিত করতে হবে। এর সুবিধাগুলো মানুষকে জানাতে হবে। আর তাই আমার নিজের বাড়ি বানাচ্ছি কংক্রিটের ব্লক দিয়ে। আমার মেশিনে নিজেরাই ব্লক বানাচ্ছি। বাড়িটা প্রস্তুত হয়ে গেলে সবাইকে দেখাতে পারব- দেখেন, আমার এই বাড়িটা বানিয়েছি ব্লক দিয়ে। ব্লক দিয়ে বাড়ি বানালে এই এই সুবিধা হয়। সবাইকে হাতে কলমে দেখিয়ে দিলে ব্লকের গুরুত্ব সবাই বুঝতে পারবে।’

ব্যতিক্রম এই উদ্যোগের শুরুর গল্পটা বলছিলেন শিপু। তার বাবা মোঃ জাহাঙ্গীর আলম রাজা একদিন একটা ফর্মা বানিয়ে আনলেন ওয়ার্কশপ থেকে। ফর্মা দেখিযে বললেন, ‘আমরা বালু-সিমেন্ট দিয়ে ইট বানাবো। দেখতো হয় কি না?’ ফর্মায় সিমেন্ট বালু মিশিয়ে ঢালা হলো। কিন্তু ব্লক হলো না। ফর্মা থেকে বালু-সিমেন্ট বের হয় না। কিন্তু শিপু হাল ছাড়লেন না।

‘কিভাবে কনক্রিট ব্লক বানানো যায়’ লিখে ইউটিউবে সার্চ দিলেন। সেখানে ব্লক বানানোর বিভিন্ন পদ্ধতি পেলেন। কিন্তু ব্লক বানানোর মেশিন কিভাবে বানানো যায় সেই ভিডিও পেলেন না। মরিয়া হয়ে খুঁজতে শুরু করলেন শাহাদাৎ হোসেন। নেট ঘেঁটে দেখলেন, সাউথ আফ্রিকার একটা কোম্পানি এই ব্লক বানানোর মেশিন বানায়। প্রতিটা মেশিনের দাম ২৫ হাজার টাকা। সাউথ আফ্রিকা থেকে আনার খরচ তো আছেই।

ইউটিউবে ভালো করে দেখে নিজে একটা ডিজাইন করলেন। ওয়ার্কশপ মিস্ত্রিকে এঁকে বুঝিয়ে দিলেন। মিস্ত্রি বানালেন প্রাথমিক ফর্মা। তার উপর চার-পাঁচবার সংযোজন- বিয়োজন করে নির্মিত হলো কনক্রিটের ব্লক বানানোর মেশিন বা ফর্মা। এখন সেই ফর্মাতেই বানাচ্ছেন সিমেন্ট-নুড়ি পাথরের কনক্রিট ব্লক।

এই ফর্মা বা মেশিন নিয়ে পরিকল্পনা জানতে চাইলে শিপু জানান, ‘গ্রিন ইকো ব্রিকস অ্যান্ড ব্লকস’ নামে একটা প্রজেক্ট নিয়ে আগানোর পরিকল্পনা তার। এই প্রজেক্টের আওতায় পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি, জনসাধারণে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি, পোড়া ইটের ব্যবহার বন্ধ করা, পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবসায় উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কনক্রিটের ব্লক প্রস্তুত প্রযুক্তিকে কুটির শিল্পের ন্যায় ছড়িয়ে দেওয়াই তার লক্ষ্য।

এতে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এসেছেন পাটগ্রাম সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক আক্তার উজ্জামান ভুঁইয়া। শিপু বাবার নামে নাম দিয়েছেন তার প্রতিষ্ঠানের। ‘রাজা ইকো ব্রিকস’। স্থানীয় রাজমিস্ত্রিদের দিয়ে ব্লক তৈরি করান। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে প্রযুক্তিটাকে ছড়িয়ে দিতে চান শাহাদাৎ হোসেন শিপু।

তিনি বলেন, ‘যে কেউ ফর্মা কিনে বানাতে পারে কনক্রিটের ব্লক। আমি নিজ দায়িত্বে ফর্মার ব্যবহার ও কাঁচামাল মেশানো শিখিয়ে দেই। বরিশাল থেকে একজন ব্লক কিনতে এসেছিল। ভেবে দেখলাম, ব্লক কিনে নিয়ে পুষবে না। ভাড়া বেশি পড়ে যাবে। তারচেয়ে ভালো হয় দুইটা মেশিন বানিয়ে দেই। তাকে দুটি মেশিন বানিয়ে দিলাম। ব্লক নির্মাণ পদ্ধতি শিখিয়ে দিলাম। এখন সে নিজহাতে ব্লক বানিয়ে বাড়ি নির্মাণে ব্যবহার করছে।’

এজন্য তিনি ১০টি দরিদ্র পরিবারকে ১০টি মেশিন দেবেন। কাঁচামাল এবং প্রশিক্ষণ দেবেন। তাদের দৈনন্দিন কাজের অবসরে দৈনিক গড়ে ৫০ পিস করে ব্লক বানাবে। মাসে ১৫০০ পিস। প্রতি পিসের মজুরী বাবদ ৬ টাকা করে মাস শেষে তাদের প্রতি পরিবারকে ৯০০০ টাকা দিয়ে ব্লকগুলো শিপু সংগ্রহ করবেন বিক্রির জন্য। এতে করে ১০টি পরিবারে বাড়তি আয়ের সংস্থান হবে। বেকারত্ব হ্রাস পাবে। কর্মমূখর পরিবেশ সৃষ্টি হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে। দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বধ্যতা থেকে কাজটা করতে চান শিপু।

বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনিস্টিটিউট (এইচবিআরআই) এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রুবেল জানান, শিপুর উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ব্লকের মাধ্যমে নির্মাণ ব্যয় ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। যে কেউ নিজহাতে খুব সহজেই এই ব্লক বানাতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এই প্রযুক্তি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া যায়নি বলে দেশবাসী এর সুফল পাচ্ছে না।

রুবেল আহমেদ বলেন, ‘আমরা বর্তমানে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও তা জনগণের কাছে জনপ্রিয় করতে কাজ করে যাচ্ছি। পোড়া ইটের বিকল্প হিসেবে কনক্রিট ব্লক অনেক বেশি কার্যকর, সাশ্রয়ী, টেকসই ও পরিবেশ বান্ধব। আমরা চাই এই প্রযুক্তি কুটির শিল্পের মতো ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিতে। এমনটা হলে শিপুর এই প্রযুক্তি খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার দ্বার।’

তথ্যসূত্র: চ্যানেল আই

About khan

Check Also

যে কারণে আর কাউকে বিয়ে করেননি শ্রীলেখা, এতদিনে সত্যিটা জানা গেলো!

পাওয়া না পাওয়ার হিসেবে প্রেমের ব্যাখ্যা হয় না। অতীতের আভিজাত্যে তা পূর্ণতা পায়। সকালের শিশিরের ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page