Sunday , September 26 2021
Breaking News

এসএসসিতে গোল্ডেন A+ পেয়ে বদলে গেছে সুমাইয়ার জীবন

বদলে গেল সুমাইয়ার জীবন- মাত্র একদিন আগেও যে সুমাইয়ার লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া নিয়ে চরম সংশয় ছিল, সেই সুমাইয়ার জন্য বুধবার (১০ জুন) দিনটি ছিল অন্যরকম।

সকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর পক্ষ থেকে তার বাড়িতে পৌঁছে যায় মিষ্টি। বাড়িতে হাজির হন দলের নেতৃবৃন্দ।

দুপুর ১২টায় মুঠোফোনে সুমাইয়াসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নেন। নেতৃবৃন্দকে নির্দেশনা দেন সুমাইয়ার বাড়ি সংস্কারের। তার লেখাপড়া চালিয়ে নিতে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দেন চিফ হুইপ।

বুধবার এমনই এক স্বপ্নীল দিন অতিবাহিত করেছে চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় মাদারীপুরের শিবচরে ১ম স্থান অধিকারী গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া পাঁচ্চর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া ফারহানা ও তার পরিবার।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পেশায় দর্জি দেলোয়ার হোসেন শ্বশুরের দেয়া জমিতে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার মাদবরচর ইউনিয়নের সাড়ে এগারো রশি লপ্তিকান্দি গ্রামে বসবাস শুরু করেন সাত বছর আগে।

তিনি সংসার চালাতে ঢাকার সাভার, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে দর্জির কাজ করেছেন। সাত বছর আগে ঘরের কাজ অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থায় শ্বাসকষ্টে দেলোয়ারের মৃ’ত্যু হয়।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখেন তার স্ত্রী সালেহা বেগম। নিজে ঘরে বসে দর্জির কাজ শুরু করেন।

বড় মেয়ে তাসলিমা কেজি স্কুলে চাকরি করে মায়ের সঙ্গে সংসারের হাল ধরেন। মেয়ে-জামাইদের আর্থিক সহায়তায় কোনো মতে চালিয়ে যাচ্ছেন সংসার। অর্থাভাবে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন অল্প বয়সেই।

ছয় মেয়ের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সুমাইয়া ফারহানা। অভাবের সংসারে সুমাইয়ার লেখাপড়া চালানোর সাহস পাচ্ছিল না তার মা। তবে লেখাপড়ার প্রতি সুমাইয়ার প্রবল টান থাকায় বোনদের সহায়তায় লেখাপড়া চলতে তাকে। পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫সহ টেলেন্টপুলে বৃত্তি পায় সুমাইয়া।

৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পাঁচ্চর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির পর মেধাবী সুমাইয়া বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলে মনজয় করে ফেলে বিদ্যালয়য়ের প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকদের। সুমাইয়ার পরিবারের অসহায়ত্বের কথা জেনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষও তাকে নিয়মিত খাতা, কলম, বই দিয়ে সহযোগিতা করে। তাকে প্রাইভেট পড়িয়ে কোনো শিক্ষক টাকা নেয়নি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়মিত বৃত্তি প্রদানেরও ব্যবস্থা করে।

চলতি বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সুমাইয়া। পরীক্ষার ফলাফলে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করে সে। এরপরও তার লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া নিয়ে শঙ্কায় ছিল পরিবার। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বুকে ধারণ করা পিতৃহীন সুমাইয়ার চোখে-মুখে ছিল হতাশার ছবি। ডাক্তারতো অনেক দূরের কথা ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়েই সংশয় ছিল তার।

সুমাইয়ার এমন অবস্থার খবর জানতে পারেন স্থানীয় সংসদ সদস্য চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী। তিনি মঙ্গলবার (৯ জুন) রাতে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার খবর নেন। পরদিন সকালে চিফ হুইপ সুমাইয়ার বাড়িতে মিষ্টি পাঠান। দুপুর ১২টার দিক ফোন দিয়ে সুমাইয়া, তার মা, বড় বোন ও স্কুলের শিক্ষকসহ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলেন।

তিনি সুমাইয়ার লেখাপড়া চালিয়ে যেতে কি কি প্রতিবন্ধকতা ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তা জানতে চান এবং তার লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পাশে থাকার আশ্বাস দেন। তাদের পলেস্তারাবিহীন ঘর সংস্কার করে ফ্লোর টাইলস ও দরজা লাগানোসহ বাড়িতে সুপেয় পানির ব্যবস্থার নির্দেশনা দেন। এছাড়াও জেলা পরিষদ থেকে সেলাই মেশিন ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সুমাইয়াকে স্মার্টফোন দেয়া হয়।

চিফ হুইপের নির্দেশনায় স্কুলটির প্রধান শিক্ষক মো. সামচুল হক, জেলা পরিষদ সদস্য আয়শা সিদ্দিকা মুন্নী, ইউপি চেয়ারম্যান চৌধুরী সুলতান মাহমুদ, উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ খায়রুজ্জামান খান, প্রেস ক্লাব সভাপতি একেএম নাসিরুল হক, সাধারণ সম্পাদক প্রদ্যুৎ কুমার সরকার ,স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলু মুন্সী, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগেরসাধারণ সম্পাদক মতি হাওলাদার সুমাইয়ার বাড়িতে ও স্কুলে ছুটে যান।

সুমাইয়া ফারহানা বলেন, আজকের দিনের মতো এতো হাসিখুশি ও সুন্দর দিন আগে আমাদের আসেনি। চিফ হুইপ স্যার ফোনে আমাকে বলেছেন তোমার লেখাপড়া চালিয়ে যেতে কি লাগবে বলো? আমি তার দোয়া চেয়েছি। তিনি আমাদের বাড়িঘর নতুন করে সংস্কারসহ যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমার লেখাপড়া নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল তা কেটে গেছে।

সুমাইয়ার মা সালেহা বেগম বলেন, মেয়ে ভালো রেজাল্ট করলেও অর্থকষ্টে পড়াতে পাড়বো কি-না জানতাম না। চিফ হুইপ স্যার সকল সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। আমরা চিরকৃতজ্ঞ।

পাঁচ্চর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সামসুল হক বলেন, সুমাইয়ার খবর পেয়ে রাতেই চিফ হুইপ স্যার আমাকে ফোন দেন। সকালে তিনি নেতৃবৃন্দকে পাঠান। সুমাইয়ার লেখাপড়া নিয়ে আর কোনো সংশয় নেই। ওর লেখাপড়ার পরিবেশ ভালো করতে বাড়ির পরিবেশও পাল্টে দিয়েছেন তিনি।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেয়েদের শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দেন। তিনি বৃত্তি-উপবৃত্তি ছাড়াও মেয়েদের লেখাপড়া ফ্রি করে দিয়েছেন।

নূর-ই-আলম চৌধুরী বলেন, এর আগে আমি সুমাইয়ার ইংরেজি বক্তব্য শুনেছি। সে দরিদ্র পরিবারের অদম্য মেধাবী। তার রেজাল্ট দেখে আমি নেতৃবৃন্দকে তাদের বাড়িতে পাঠিয়েছিলাম। তাদের বাড়ির অবস্থা অসম্পূর্ণ। তাই আমি বাড়িটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্পূর্ণ করে দিব। এছাড়াও অন্য সংস্থা ও জনপ্রতিনিধিও সুমাইয়ার পাশে থাকবে। তার শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আমরা পাশে থাকবো। এ রকম ছেলে-মেয়েদের পাশে সকলের থাকা উচিত।

About khan

Check Also

চাকরি ছেড়ে আচার বিক্রি করে ৮ লক্ষ টাকা আয় সামিরার; ৭দেশে রপ্তানি

বগুড়ার মেয়ে সামিরা সামছাদ। বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক সমাপনী পরীক্ষা দিয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *