Thursday , December 3 2020
Breaking News
Home / Education / এই লেখাটি লিখব-লিখব করছি অন্তত গত ৪ বছর ধরে part 6

এই লেখাটি লিখব-লিখব করছি অন্তত গত ৪ বছর ধরে part 6

যখন আইবিএ’র সামনে এসে পৌঁছলাম, তখন ঘড়িতে ৫:৫২। নেমেই দেখলাম আইবিএ’র সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমার ছোটভাই পাপ্পু আর ওর ফ্রেন্ড আরেফিন। তখন আমার গিফটশপ ‘দোভানা’ ছিল। পাপ্পু আর আরেফিন ছিল আমার ওয়ার্কিং পার্টনার। ওরা পুরান ঢাকার চকবাজার থেকে দোকানের জন্য পাইকারি দরে মালামাল কিনতে প্রায়ই ঢাকায় আসত।

আমি বিসিএস পরীক্ষার জন্য দোকান থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলাম। ওরাই সবকিছু চালাত। দোকানের মালামাল কেনার কাজে আগে থেকেই ওরা ঢাকায় ছিল। ওদেরকে বলেছিলাম, আইবিএ’র এমবিএ প্রোগ্রাম অফিসের সামনে গিয়ে আমাকে একটু পরপর ফোনে আপডেট জানাতে ভাইভা বোর্ডের কী অবস্থা। ওদের সাথে বারবার কথা বলে-বলে জেনে নিচ্ছিলাম, ইন্টারভিউ বোর্ড এখনও আছে কি না, প্রোগ্রাম অফিসে গিয়ে যেন বলে, আমি ফ্লাইট ডিলে হওয়ায় ঠিক সময়ে আসতে পারছি না, রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম, ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমি নামামাত্র ওরা জানাল, “দাদা ৪-৫ মিনিট আগে বোর্ড উঠে গেছে। এখন শুধু এক্জিকিউটিভ এমবিএ’র ভাইভা বাকি।” রোমেল ভাইকে ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমি দৌড়ে দোতলায় এমবিএ প্রোগ্রাম অফিসে গেলাম। আমাকে দেখেই ওখানকার সবাই কাজ ছেড়ে একবার আমার দিকে তাকালেন।

রাহী স্যারকে দেখলাম কী একটা যেন কাজে ব্যস্ত, আমার সালামের উত্তর দিলেন না। “স্যার, আমার আসতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমি অনেক চেষ্টা করেও ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারিনি। আমি……..” আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই উনি অনেকটা চিৎকার করে বললেন, “You Idiot! Get out!” “স্যার, আমি………” “I said, Get out! Out! Out!! আমি খুব ভাল করেই জানতাম, তুমি ঠিক সময়ে আসতে পারবে না। চিটাগাং থেকে একটা একজাম দিয়ে ঢাকায় এসে আরেকটা একজাম দেয়া যায় নাকি? এত সহজ? শুধু-শুধু আমার সময় নষ্ট করলে! সবাইকে বলে রেখেছিলাম, চিটাগাং থেকে একটা ছেলে সোয়া ৫টায় আসবে, ওর ভাইভা নিতে হবে। Did you think I am a joker?” “স্যার, আমি অনেক কষ্ট করে এসেছি। ফ্লাইট ডিলে করেছে, রাস্তায় অনেক জ্যাম ছিল। আমি আসলেই……..” “It’s none of my business! Get out! যেখান থেকে এসেছ, সেখানে চলে যাও।” “স্যার, আমার অনেক স্বপ্ন ছিল আইবিএ’তে পড়ার।” “ওরকম স্বপ্ন রাস্তাঘাটের সবারও থাকে। I gave you a chance but you missed it. That’s all!

বেরিয়ে যাও এখান থেকে।” “স্যার, একটু দয়া করেন……..” (ইচ্ছে করছিল, স্যারের পায়ে পড়ে কেঁদে ফেলি……) পাশেই স্যারের চাইতে অনেক কম বয়সি একজন সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক বসেছিলেন। উনি বললেন, “স্যার, উনার সম্পর্কে আমি শুনেছি। উনার ছোটভাই বারবার আমাদের প্রোগ্রাম অফিসে আসছিলেন। কয়েক ঘণ্টা ধরে ওরা অফিসের সামনে দাঁড়িয়েছিল। উনার ফ্লাইট আসলেই ডিলে করেছে। আর আজকে ঢাকার রাস্তায়ও অনেক জ্যাম। আমার এক বন্ধু কিছুক্ষণ আগে আমার রুমে এল এয়ারপোর্ট থেকে; ওরও আসতে অনেকক্ষণ লেগেছে। উনাকে একটা সুযোগ দিন, স্যার।

এতদূর থেকে এত কষ্ট করে রিস্ক নিয়ে এসেছে! কালকেও নাকি একটা রিটেন একজাম আছে। বেচারাকে আজকেই আবার চট্টগ্রামে ফিরতে হবে।” “বাবু, তোমরা জুনিয়র ফ্যাকাল্টিরা কী বল, কী ধরনের রিকোয়েস্ট কর, তোমরা নিজেরাই তা জানো না। ওর জন্য ওকালতি করছ কেন? ও কি তোমার আত্মীয় নাকি?” “না না স্যার, উনাকে তো আমি দেখলামই আজকে প্রথম। বেচারার চোখমুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন, স্যার। আসলেই অনেক কষ্ট করে এই পর্যন্ত এসেছেন। একটু ফেভার করুন, স্যার।” “You have no idea what you are talking about! এক্জিকিউটিভ এমবিএ’র ভাইভা আর ওদের ভাইভা কি একইরকমের হবে নাকি? ওদের চাকরির এক্সপেরিয়েন্সই আছে ৩ বছরের, আর সে তুলনায় তো এরা শিশু! এটা পারা যাবে না, ভাই। আই অ্যাম সরি!” “স্যার, একটু হেল্প করেন বেচারাকে।

অনেক আশা নিয়ে এতদূর থেকে এসেছেন!” “বাবু, তোমাকে নিয়ে আর পারা গেল না!” আমি মাথা নিচু করে একটু দূরে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে উঁচু গলায় বললেন, “এই স্টুপিড! গাধার মতন দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও, তিনতলায় যাও! গিয়ে একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক। তোমাকে আমরা ডাকব।” আমি সত্যিই বুঝতে পারছিলাম না, এর চাইতে সুন্দর মুহূর্ত পৃথিবীতে কখনও কোথাও এসেছিল কি না! আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। বাবু স্যারের জন্য বারবার মন থেকে প্রার্থনা করলাম। রাহী স্যারকে মনে হচ্ছিল আমার পিতৃতুল্য। মায়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল বারবার: “স্যারদের বকায় কক্ষনো রাগ করতে নেই। স্যারদের বকা মানে, আশীর্বাদ।” প্রচণ্ড আবেগাপ্লুত হয়ে স্যারদেরকে ধন্যবাদ আর সালাম দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় রাহী স্যার পেছন থেকে বলে উঠলেন, “এই পাগল!

বোর্ডে ঢোকার আগে চুলগুলি আঁচড়ে নিয়ো! বেসিনে মুখ ধুয়ে ফেলো! এত ভয় পেয়ো না! হাহাহা…….” আর কিছুই বলতে পারলাম না। স্যারের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। দুই চোখের জলে আমার গাল ভিজে গেছে। বাবু স্যার আমার কাঁধে হাতটা রেখে বললেন, “যান, যান, উপরে গিয়ে ওয়েট করুন। We are not that much bad people as you thought us to be. Sometimes even the IBA faculties are too good! ফ্রেশ হয়ে নিন, ভালভাবে ইন্টারভিউ দিন, এখন তো আর কোনও টেনশন নেই। কালকে কী পরীক্ষা?” “স্যার, গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতা।” “যাবেন কীভাবে?” “স্যার, প্লেনের রিটার্ন টিকেট করা আছে।” “গুড! আরে ভাই, চোখেমুখে পানি দিয়ে চেহারা ঠিক করেন। ভাইভা দিয়ে দ্রুত এয়ারপোর্টে দৌড়ান! Good luck!” ওই মুহূর্তে ইচ্ছে করছিল, স্যারকে পা ছুঁয়ে সালাম করি। মুহূর্তের তীব্র ভালোবাসায় মানুষ ভয় পেয়ে যায়। প্রথমবারের মতো হঠাৎই মাথায় এল, “আমি যদি স্যারদের এই ভালোবাসার সম্মান রাখতে না পারি? শেষ পর্যন্ত যদি আইবিএ’তে চান্স না পাই?”

আমরা যখন বিপদে পড়ি, যদি নিয়ত ভাল থাকে, একটা উপায় বের হয়ে যায়ই! তিনতলায় ওয়াশরুমে গিয়ে চুলগুলিকে পানি দিয়ে ভিজিয়ে বসিয়ে-বসিয়ে যথাসম্ভব ‘মানুষ করা’র চেষ্টা করলাম। চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিয়ে নোটিসবোর্ডের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ১০ মিনিট পর আমাকে ডাকা হল। ঘড়িতে ৭টা ছুঁইছুঁই। একটা রুমে গিয়ে দেখলাম, অনেক স্যার বসে আছেন। ইন্টারভিউতে এত স্যার থাকেন, আগে জানতাম না। ভাবলাম, আইবিএ’র ইন্টারভিউ বোধ হয় এরকমই।

পরে জেনেছিলাম, শুধু আমার জন্যই ওই বোর্ডটা বসানো হয়েছিল। বাবু স্যার আর রাহী স্যার ছাড়া আর কাউকেই চিনতাম না। ভর্তি হওয়ার পর বুঝেছি, ওখানে সেদিন সন্ধ্যায় যারা ছিলেন, তারা আইবিএ’র সবচাইতে সিনিয়র এবং দক্ষ ফ্যাকাল্টি। সাইফুল মজিদ স্যার, শামা-ই-জহির স্যার, মামুন স্যার, মুনির খসরু স্যার, নিয়াজ স্যার, সাইফ নোমান খান স্যার ছিলেন সেই বোর্ডে। জুনিয়র ফ্যাকাল্টিরা বেশিরভাগই ভাইভা নিয়ে বাসায় চলে গিয়েছিলেন, কিছু সিনিয়র স্যার নিজেদের রুমে বসেছিলেন এক্জিকিউটিভ এমবিএ’র ভাইভা নেয়ার জন্য। উনাদের কাউকে-কাউকে ডাকা হয়েছিল। ভাইভা বোর্ডে ছিলাম প্রায় ১৮-২০ মিনিট। স্যারদের অনেকেই আমার সেদিনের ব্যাপারটা জানতেন। ‘ভর করা’ বলে একটা ব্যাপার জীবনে কখনও শুনেছিলাম।

মানুষ বিশেষ-বিশেষ সময়ে বিশেষ কিছু বাহ্যিক প্রভাবক কিংবা পরিস্থিতির কারণে হঠাৎ করেই বিশেষ শক্তি লাভ করে। সেসময় সে স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে ভিন্ন রকমের আচরণ দেখায়। ভেতরের অসীম শক্তির সর্বোচ্চটুকু কাজে লাগাতে পারে। আবেগ আর ক্ষমতার আশ্চর্য সুষম সংমিশ্রণে ভেতরকার সেরা মানুষটিই বেরিয়ে আসে। আমি ভাইভা বোর্ডে ঢোকার পর থেকে খুব সম্ভবত অন্য মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম কিংবা আমার ভেতরের সবচাইতে সেরা ‘আমি’টাই সেদিন বেরিয়ে এসেছিল। সৃষ্টিকর্তার কোন ইশারায় সেদিন এমন হয়েছিল, জানি না। কোনও সংকোচ, দ্বিধা, নার্ভাসনেস, ভয়, সারাদিনের ক্লান্তি, জড়তা কিছুই কাজ করছিল না। খুবই সাবলীল আর পাখির পালকের মতোই হাল্কা বোধ করছিলাম। মনে হচ্ছিল, এখন যা বলছি, করছি, সেটাই সেরা।

আমার জীবনের সেরা মুহূর্তটা এখন এই মুহূর্তে পার করছি। পূর্ণ সততা নিয়ে বলতে পারি, সেদিন যে স্টাইলে ইংরেজিতে কথা বলছিলাম, আজকের দিন পর্যন্ত আমি আমার সারাজীবনেও কোনওদিনও অতোটা নির্ভুল আর সাবলীলভাবে ইংরেজিতে কথা বলতে পারিনি। সেদিন বোর্ডে স্যাররা বিভিন্ন ধরনের রসিকতায় মেতে উঠেছিলেন। আমাকে নিয়ে অনেক মজা করছিলেন। খুব সম্ভবত, স্যাররা চাইছিলেন, আমাকে কোনও না কোনওভাবে ‘নাড়িয়ে দিতে’। কেন জানি না, কার ইশারায় জানি না, আমি সেদিন খুব ঠাণ্ডা মাথায় হাসিমুখেই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলাম একএক করে।

সেদিনের পুরো ঘটনা, এবং এর আগের ফেসবুকের বিষয়গুলি বর্ণনা করা থেকে শুরু করে, নানান বিচিত্র বিষয়ের উপর স্যাররা ইংরেজিতে ইন্টারভিউ নিয়েছেন। (আইবিএ’তে অবশ্য বাংলায় ইন্টারভিউ দেয়ার বিন্দুমাত্রও সুযোগ নেই।) আমি কেন এমবিএ’টা করতে চাইছি, সরকারি চাকরির পরীক্ষাই যদি দেবো তবে আইবিএ’তে কেন, আমার দুর্বল দিকগুলি, কখনও প্রেম করেছি কি না, অবসর কীভাবে কাটাই, বইপড়া নিয়ে কিছু কথা, বাংলাদেশের নানান অর্থনৈতিক বিষয়, আমার কিছু ব্যক্তিগত আর পারিবারিক ব্যাপার, আমার ভবিষ্যতের প্ল্যান, রুদ্ধশ্বাস মোটরবাইক জার্নি নিয়ে এ-টু-জেড, বিসিএস পরীক্ষাপদ্ধতি, ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও কেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলাম, কেন দেরিতে অনার্স করলাম, ঠিকমতো পড়াশোনা করিনি কেন, সিজিপিএ এত কম কেন, কী খেতে ভালোবাসি, কোন ধরনের ব্যক্তিত্বের মানুষ পছন্দ করি, আইবিএ সম্পর্কে কী কী জানি, কিছু সাম্প্রতিক বিষয়সহ আরও কিছু প্রশ্ন। খুব দ্রুত শুদ্ধ ইংরেজিতে উত্তর করছিলাম। এটার তারিফও স্যাররা করেছিলেন। খুবই সহজসরল অকপট ভঙ্গিতে একটা ভাইভা দিলাম। একটা বর্ণও মিথ্যে বলিনি সেদিন।

ভেবেটেবে কিছুই বলতে হয়নি, মাথায় যা এসেছে, তা-ই বলেছি, তাই বানিয়ে মিথ্যে বলার সুযোগও পাইনি। শেষে একটা গান গাইতে বললেন। আমি যখন বললাম, “I can’t, Sir.” তখন বাবু স্যার আমাকে আমার ইনফো-ফরম দেখিয়ে হেসে বললেন, “But you’ve claimed so.” আমি প্রিয় শখের জায়গায় লিখেছিলাম, Reading, Writing, Singing……… সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, আমি আমার জীবনের সেরা দিনটি আজকে কাটালাম। গাইলাম, “আজ এই দিনটাকে……..” “I see, we’re getting a singer for our cultural program!” সাইফুল মজিদ স্যার এই কথাটি বলার সময় বাবু স্যার বললেন, “স্যার, উনার কালকেও একটা পরীক্ষা আছে।

উনি বোধ হয় আজকেই রাতের ফ্লাইটে চট্টগ্রামে ফিরবেন।” তখন তিন-চার জন স্যার একসাথেই বলে উঠলেন, “বল কী! ও এখনই চিটাগাং ফিরবে? আচ্ছা, তুমি দৌড়াও, দৌড়াও! নিচে গিয়ে দেখ তোমার সুপারম্যান বাইকার আছে কি না! হাহাহা………” আসার সময় যখন সালাম দিয়ে বের হয়ে আসছিলাম, তখন স্যাররা বলছিলেন, “Best of luck for your tomorrow’s exam.” আমার বারবারই মনে হচ্ছিল, আমার হবে, আমার হবে! (বিসিএস ভাইভা দেয়ার পরও আমার অতটা ভাল লাগেনি।)

About khan

Check Also

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগঃ (Corona virus) নিয়ে সাম্প্রতিক প্রশ্ন উত্তর

Corona virus)সাম্প্রতিক প্রশ্ন (#collected) ১) করোনা ভাইরাস কত সালে আবিষ্কার হয়? উঃ ১৯৬০ ২) কোভিড-১৯ ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page