Friday , December 4 2020
Breaking News
Home / Education / এই লেখাটি লিখব-লিখব করছি অন্তত গত ৪ বছর ধরে part 7

এই লেখাটি লিখব-লিখব করছি অন্তত গত ৪ বছর ধরে part 7

আমি যখন আইবিএ থেকে বের হই, তখন ঘড়িতে সাড়ে ৭টা। আমি জানতাম, আমি কোনভাবেই ৭:৪৫টার ফ্লাইট ধরতে পারব না। আমি এও জানতাম, আমি জানি না, কীভাবে আজকে রাতে চট্টগ্রামে যাব। ওটা নিয়ে ভাবতেও ইচ্ছে করছিল না। একটা ভাল পরীক্ষা দেয়ার প্রচণ্ড ভাললাগার ফুরফুরে অনুভূতি কাজ করছিল শুধু। পাপ্পু আর আরেফিন মধুর ক্যান্টিনে আমার জন্য ওয়েট করে ছিল।

ওদেরকে সাথে নিয়ে ঢাকা ভার্সিটির সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে গিয়ে আয়েশ করে সবজি পাকোড়া আর চা খেতে লাগলাম। আমার অনেক স্টুডেন্টই ঢাকা ভার্সিটির বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে পড়ত। অনেকেই দেখা করতে এল। ইন্টারভিউতে কী কী জিজ্ঞেস করল, সেসব জিজ্ঞেস করছিল। সারাদিনের অবিশ্বাস্য সব অভিজ্ঞতার পর আমার মাথা প্রায় পুরোটাই ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কেন চট্টগ্রামে ফেরার জন্য আমি বিন্দুমাত্রও তাগিদ অনুভব করছি না। পাপ্পু জিজ্ঞেস করল, “দাদা, রাতের বাসে যাবি?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, যাওয়া যায়।”

(এখন ভাবলেই মজা লাগে, আমি অতটা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ‘যাওয়া যায়’ বলেছিলাম!) তখন রাস্তার অবস্থাও ভাল না, জ্যাম লেগেই থাকে। আমার মাথাতেই নেই, যদি কালকে ১০টার আগে পৌঁছতে না পারি, তাহলে কী হবে? চট্টগ্রামে বাসা, এমন এক প্রিয় ছোটভাই এবং আমার এক্স-স্টুডেন্ট রিপন বলল, “দাদা, আমার কাছে একটা ট্রেনের ননএসি টিকেট আছে; তূর্ণা নিশীথার, আজকে রাতে ছাড়বে। আজকে চট্টগ্রামে না গেলেও আমার চলবে। দাদা, আপনি যান।” “আচ্ছা, ঠিক আছে।” বলে সেই টিকেটটি নিয়ে আমি কমলাপুর স্টেশনের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলাম।

সে রাতে ট্রেন ছাড়ল প্রায় দেড় ঘণ্টা লেট করে। আমি ভাবতেও চাইছিলাম না, কী ঘটতে যাচ্ছে! নিজেকে এর অনেক আগেই ভাগ্যের হাতে সমর্পণ করে দিয়েছি। মনেমনে শুধু এটাই বারবার বলছিলাম, যা হওয়ার তা-ই হবে। আমি চাইলেও হবে, না চাইলেও হবে। এবং যা হচ্ছে, নিশ্চয়ই ভালর জন্যই হচ্ছে, যা হবে, তাও নিশ্চয়ই ভালর জন্যই হবে। দেখা যাক! সারাদিনের ক্লান্তি শেষে খুব শান্তির একটা ঘুম হল। হঠাৎ আশেপাশের হৈচৈ শুনে ঘুম ভেঙে গেল। ট্রেন কুমিল্লায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। লাইনে নাকি কী একটা সমস্যা হয়েছে। প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা সেখানে দেরি হল। আমি বুঝতে পারছিলাম না,

আমার কেন কোনও ধরনের দুশ্চিন্তা হচ্ছে না! আবারও ঘুমিয়ে পড়লাম। পৃথিবীর একমাত্র বিশ্বস্ত প্রেমিকা হল ঘুম। যখনই চাই, কাছে পাই। কখনওই, কোনও অবস্থাতেই ছেড়ে যায় না। ঘুমকে ভালোবাসার মতন নিখাদ ভালোবাসা আর হয় না।

পরেরদিন ট্রেন যখন চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে পৌঁছল, তখন সকাল পৌনে ১০টা। আমার পরীক্ষা ১০টা থেকে। স্টেশন থেকে আমার বাসায় যেতে মাত্র ১৫ মিনিট লাগে। বাসায় গিয়ে দেখি, মা আমার পেন্সিল বক্স, বোর্ড, স্কেল, কলম, ক্যালকুলেটর, অ্যাডমিট কার্ড, রেজিস্ট্রেশন কার্ড সবকিছু রেডি করে হাতে নিয়ে বসে আছেন। বাসায় বাবা-মা খুব টেনশন করছিল। রাত দেড়টার পর থেকে বাসায় আর কথা বলতে পারিনি। মোবাইলে চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল। (তখন আমি সস্তা দামের নোকিয়া ১১০০ মোবাইল সেটটা ব্যবহার করতাম।

ওটাকে সবাই বলত, জাতীয় সেট! সেটটা খুব মজবুত ছিল বলে অনেকে বলতো, দোস্তো, তোর সেট দিয়ে তো কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া যাবে! বন্ধুদের মধ্যে যারা দামি মোবাইল ব্যবহার করতো, তাদেরকে মজা করে বলতাম, আমার মোবাইলটার মডেল ‘এন ইলেভেন জিরো জিরো’!) মা আমাকে দেখেই বললেন, “বাবা, কেমন আছিস? আজকের পরীক্ষা দিবি?” আমি অনুভূতিশূন্য বোধ করছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি এই মুহূর্তে একটা পালকের চাইতেও হাল্কা, কী এক নেশায় এদিকওদিক উড়ে বেড়াচ্ছি! হেসে বললাম, “মা, আমি খুব ভাল আছি।

পরীক্ষা দেবো।” এটা বলে মায়ের হাত থেকে গোছানো শপিং ব্যাগটা নিয়ে ওই অবস্থাতেই বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। তখন ঘড়িতে ১০:০৫টা। আমাদের বাসা থেকে পরীক্ষার সেন্টারে যেতে সিএনজি’তে অফিস আওয়ারে অন্তত ৩০ মিনিট লাগে। যখন কলেজ গেইটে পৌঁছলাম, তখন ১০:৪৩টা। সেদিন গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতার পরীক্ষা। প্রথম ২ ঘণ্টা গাণিতিক যুক্তি এবং পরের ১ ঘণ্টা মানসিক দক্ষতার পরীক্ষা।

পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে ৪৩ মিনিট আগেই। পুলিশ স্বাভাবিকভাবেই আমাকে ঢুকতে দিচ্ছিল না। আমি অনেক রিকোয়েস্ট করলাম, কী হয়েছিল, বারবারই সেটা বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম, তবুও ওরা কিছুই শুনতে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু আমার মাথায় আছে, আমি তো ফিরে যাবই না, আমি ভেতরে ঢুকবই ঢুকব। ওখানে একটা ছোটখাটো জটলা বেধে গেল। জটলা দেখে ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয় এলেন। আমার সব কথা শুনে বললেন, হাতে তো মাত্র এক ঘণ্টা আছে। এ সময়ের মধ্যে সব অংক করে ফেলতে পারবেন? কোনও চিন্তা না করেই বললাম, “পারব, স্যার!” “ঠিক আছে, যান।

Good luck!” উনার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে উঠল। উনাকে ওই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, মানুষ নয়, দেবতা! গেলাম, প্রশ্ন দেখলাম, পরীক্ষা দিলাম। এমনকি আমার পাশের জনকে ৩টা অংক দেখালামও। (উনি ৩০তম ব্যাচেই অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস্‌-এ চাকরি পেয়েছিলেন।) সেদিনের পরীক্ষায় ৯৮ পেয়েছিলাম; ম্যাথসে ৫০, মেন্টাল অ্যাবিলিটিতে ৪৮। এরপর………সবাই যেমন করে বলে আরকি—বাকিটা ইতিহাস!

তবে এটা ঠিক, যদি সেদিনের পরীক্ষাটা অংক না হয়ে অন্যকিছু হত, তবে আমার জাস্ট ‘খবর’ ছিল। আমি অংক পারি, কারণ বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় সেসময় যে ধরনের অংক আসত, সেগুলি না-পারাটা আমার জন্য সহজ ছিল না। ওসব অংক করতে ব্রেইনে অতো চাপ পড়ে না, আর ৩০তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় সহজ অংকই এসেছিল।

খুব ভালভাবে প্রতিটি স্টেপ দেখিয়ে আর সাইড-নোট দিয়েও যদি করি, সেগুলি করতে আধা ঘণ্টার বেশি সময় লাগার কথা নয়। আমার লাগেওনি। তবে আগেরদিন আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর পরীক্ষা আড়াই ঘণ্টা দেয়াটা রিস্কি ছিল। আসলে পুরো ব্যাপারটা যতই অবিশ্বাস্য হোক না কেন, সবকিছুই সৃষ্টিকর্তা বা প্রকৃতি কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত ছিল বলেই মনে হয়।

আমাদের স্বল্প বুদ্ধিতে যেটা ব্যাখ্যাতীত, সেটাই স্রষ্টার কাছে সহজ স্বাভাবিক ঘটনা। আমাদের সকল ব্যর্থতা এবং সাফল্য আগে থেকেই ঠিক করা আছে। তবে সেটাতে পৌঁছানোর জন্য চেষ্টাটা কিংবা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজটা আমাদেরকেই করতে হয়। আমার তো অনার্সই পাস করার কথা ছিল না। কিন্তু, আমি অনার্স পাস করব, বিসিএস ক্যাডার হবো, আইবিএ’তে পড়ব—-এগুলির সবকিছুই ছিল আমার নিয়তি। আমার নিয়তি অন্যকোথাও বাঁধা থাকলে আমি সেখানেই যেতাম। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আরও একটা মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছিলাম—এমডিএস।

সে কোর্সটি ৩ মাস কন্টিনিউ করার পর নিজের ইচ্ছেতেই ছেড়ে দিই। ওরা বলেছিল, আমি যে একই সময়ে আইবিএ’তে আরও একটা মাস্টার্স করছি, সে ব্যাপারটা অফিশিয়ালি লুকাতে হবে। আমি মিথ্যে বলতে রাজি হইনি। এটা নিয়ে অবশ্য আমার মধ্যে কোনও দুঃখও নেই। আমি মেনে নিয়েছি, আসলে সে মাস্টার্সটি করা আমার নিয়তিতে লেখা ছিল না।

এটাই সত্যি, এটাই বাস্তবতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভিনিং এমবিএ কোর্সের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ষষ্ঠ হয়ে ফাইন্যান্সে ভর্তি হয়েছিলাম, সেখানে ক্লাস করতে হয়নি। তার আগেই আইবিএ অ্যাডমিশন টেস্টের রেজাল্ট হাতে পেয়ে যাই। আমি ফাইন্যান্সেই মাস্টার্স করেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই, কিন্তু ইভিনিং এমবিএ প্রোগ্রামটা আমার ভাগ্যে নির্ধারিত ছিল না, তাই মাস্টার্সটা ওখান থেকে করা হয়নি।

About khan

Check Also

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগঃ (Corona virus) নিয়ে সাম্প্রতিক প্রশ্ন উত্তর

Corona virus)সাম্প্রতিক প্রশ্ন (#collected) ১) করোনা ভাইরাস কত সালে আবিষ্কার হয়? উঃ ১৯৬০ ২) কোভিড-১৯ ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page