Wednesday , November 25 2020
Breaking News
Home / Education / এক বিসিএস ক্যাডারের সফলতার গল্প ”বিশ্বাস থাকলে সাফল্য আসবেই”

এক বিসিএস ক্যাডারের সফলতার গল্প ”বিশ্বাস থাকলে সাফল্য আসবেই”

‘‘আমাদের বাড়িটা ময়মনসিংহ শহরের একেবারে কেন্দ্রে। বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। ছোট থেকেই দেখতাম কেউ বাসায় আসলে বলত ‘এটা কি স্যারের বাসা?’ অন্যদের বাসায় গিয়ে তাদের নাম ধরে ডাকলেও আমাদের বাসায় এসে, ‘বলত স্যার আছেন?’ এ বিষয়টাই মনে গেঁথে যায়। বুঝতে পারি এটা একটা আলাদা সম্মান। আর পেছনে যা রয়েছে তা হল শিক্ষা। তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নেই উচ্চ শিক্ষিত আমাকে হতেই হবে।’’

তিনি আ আ ম আমীমুল ইহ্সান খান। ২৭তম বিসিএসে কাস্টমসে প্রথম। বাড়ি ময়মনসিংহ শহরে স্টেশন রোড এলাকায়। ৬ ভাইবোনের মধ্যে মধ্যে ইহসান তৃতীয়। ১৯৯৪ সালে ময়মনসিংহ গভঃ ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে স্টার মার্কস নিয়ে মাধ্যমিক, ১৯৯৬ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন।

বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হলেও কখনই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ইচ্ছা ছিল না এই কর্মকর্তার। সাহিত্যের প্রতিই মনোযোগটা ছিল বেশি। অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যে নম্বরে সবসময়ই থাকতেন এগিয়ে। আর তাই যখন ইংরেজি সাহিত্যে পড়ার সুযোগ আসে তখন আর হাতছাড়া করেন না। ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যে।

প্রথম বর্ষ থেকেই ভাবতে থাকেন বিসিএস নিয়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাওলানা ভাসানী হলের ছাত্র ছিলেন। প্রতিদিনই ১৫ থেকে ১৬টা সংবাদপত্র আসত হলে। তবে সারাদিন ভিড় থাকায় সেসব খবরের কাগজের ধারে কাছে যাওয়া কঠিন ছিল। এজন্য ইহ্সান মনে মনে এমন একটা সময় খুঁজে বের করেন খবরের কাগজ পড়ার। যখন পেপার রুমটা থাকত একবারেই ফাঁকা। দুপুরে খাবার পর সবাই যখন বিশ্রাম নিত। তখনই ইহ্সান নিয়ে বসতেন খবরের কাগজ। একের পর এক পড়ে ফেলতেন সবগুলো। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন সব। আর এটাই পরবর্তীকালে তার বিসিএসের ভিত গড়তে সহায়তা করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রোটার্যাক্ট ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পাঠ্যপুস্তকের পড়াশোনা বাদে সাংগঠনিক সব কাজেই ছিলেন অতি উৎসাহী। বিশ্ববিদ্যালয় করসপনডেন্ট হিসেবে কাজ করতেন ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস ও নিউ নেশনে। ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। এর পাশাপাশি প্রথম বর্ষ থেকেই নিতে থাকেন বিসিএসের প্রস্তুতি। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হওয়ায় ইংরেজির উপরে বিশেষ মনোযোগ দিতে হয়নি। পত্র-পত্রিকা পড়ার অভ্যাস থাকায় প্রস্তুতি নিতে গিয়ে দেখতে পান সিলেবাসের প্রায় অর্ধেকই পড়া হয়ে গেছে।

প্রথমে অংশ নেন ২৬তম (বিশেষ) বিসিএসে। সেখানে মনোনীত হন শিক্ষা ক্যাডারের জন্য। নিয়োগ পান নেত্রকোণা সরকারি কলেজের ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে। তবে কর্মস্থলে যোগদানের পর বুঝতে পারেন এটা ঠিক তার আগ্রহের বিষয় না। ‘প্রায়শই একই বিষয় পড়াতে হত। ১ মাস পরও একই বিষয় আবার ১ বছর পরও তাই। মনে হত আমি একটা গন্ডীর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। আর সেই গন্ডী থেকে বের হতেই দিই ২৭ তম বিসিএস’- বলেন তিনি।

২৭ তম বিসিএস’ই এই কর্মকর্তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তবে এ পথটা মোটেও মসৃণ ছিলনা তার। পরীক্ষা দিয়েই তিনি বুঝতে পারেন লিখিত পরীক্ষা যেমন দিয়েছেন তাতে নিশ্চয়ই ভাল করবেন। তবে ফল প্রকাশের দিনে এক নিমিষেই উড়ে যায় সব ভাললাগা। ‘খুব কষ্ট পাই যখন দেখি আমার রোল নম্বরটি নেই তালিকায়। মনটা ভেঙ্গে যায়। হতাশ লাগতে শুরু করে। বারবার ভাবতে থাকি এত ভাল পরীক্ষা দেয়ার পরও কেন হল না।’

তবে খুব বেশিদিন এ অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় না তাকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেসময় ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় উপনীত হয়েই আগের ফলাফল বাতিল করে দেন। নতুন করে আবার ডাকা হয় মৌখিক পরীক্ষার জন্য। ভাইভার পর আসে ফলাফলের সেই কাঙ্খিত দিনটি। তিনি বলেন, ‘যখন জানতে পারি ফল প্রকাশ হয়েছে তখন নিজের রোল নম্বরটি খুঁজতে থাকি। সব ক্যাডারে নিচের দিক থেকে খুঁজতে থাকি।’ নিজের রোল নম্বরটি এসময় কোথাও খুঁজে না পেয়ে খুব হতাশ হয়ে পড়েন। এর মাঝে এক কাজিন ফোন করে জানায় সে পুলিশে নির্বাচিত হয়েছে। তখন হতাশা আরও বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘এভাবে খুঁজতে খুঁজতে কাস্টমস ক্যাডারের তালিকায় নিচ থেকে উপরে উঠতে উঠতে দেখি একদম প্রথমে আমার নাম। তখন কি যে ভাল লাগে তা বলে বোঝাতে পারবনা। পরীক্ষা ভাল দিয়েছিলাম তাই বলে যে এতটা ভাল দিয়েছিলাম যে একেবারে প্রথম হয়ে যাব সেটা বুঝিনি।’ এই অনুভূতিটা একেবারেই অন্যরকম বলে উল্লেখ করেন তিনি।

২৭ তম বিসিএসে কাস্টমসে ৬ জন কর্মকর্তা যোগ দেন সহকারি কমিশনার হিসেবে। তাদের মধ্যে ৫ জন সফল হন দ্বিতীয়বার মৌখিক পরীক্ষার পর। মা-বাবার আশীর্বাদ আর বিসিএসকে টার্গেট করে দেয়া শ্রমকেই সাফল্যের চাবিকাঠি বলে উল্লেখ করেন এই কর্মকর্তা। ২৪ নভেম্বর ২০০৮ সালে যোগ দেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে।

বিসিএস পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এই কর্মকর্তা বলেন, ১ বা ২ বছরের প্রস্তুতি দিয়ে নয়। বিসিএস দেয়ার জন্য একটা মানসিক প্রস্তুতি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম থেকেই থাকা দরকার। এতে ধীরে ধীরে ভিতটা তৈরী হয়ে যাবে। আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির চেয়ে অনানুষ্ঠানিক প্রস্তুুতি এক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর। পথ চলতে চোখ কান খোলা রাখাটাও বিসিএস প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ১ ধাপ এগিয়ে থাকার সহায়ক। তবে বিসিএস হোক বা না হোক সেটা বড় বিষয় নয়। এমনভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে যাতে বলা যায় আমি চেষ্টার কোন ত্রুটি করিনি। আর বিশ্বাস থাকলে সাফল্য আসবেই।

About khan

Check Also

৫০০মধ্যে ৪৯৯ নম্বর পেল রেকর্ড করলেন উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী স্রোতশ্রী

পাঁচশ নম্বরের মধ্যে পেয়েছেন ৪৯৯ নম্বর। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে স্রোতশ্রী রায় নামে এক ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page