Thursday , September 16 2021
Breaking News

সংগ্রামী দুই ট্রান্সজেন্ডারের বাধার পাহাড় ডিঙানোর গল্প

বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার অব পাবলিক হেলথের শিক্ষার্থী তাসনুভা আনান শিশির৷ তার শৈশব-কৈশোর অন্য শিশুদের মতো ছিল না৷ আশেপাশের মানুষের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য,

হে’নস্থার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন৷ সেই অতীত স্মৃ’তি বরাবরই তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক৷ শিশির বলেন, একটা ছেলের শরীর নিয়ে কারো আচরণ যদি মেয়েলি হয়, তাহলে,

‘‘সেই আচরণে কেউ সমর’্থন দেয় না, বরং অনবরত বুলিং, হে’নস্থার শিকার ‘হতে হয়, যৌ’ন হয়রানির শিকার ‘হতে হয়৷ সেরকম প্রতিবন্ধকতা ভেদ করেই আজকের জায়গা তৈরি করতে হয়েছে৷’’ তাসনুভা আনান শিশির পড়াশোনা করছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে আরেক ট্রান্সজেন্ডার নুসরাত মৌ এর গল্প ভিন্ন রকমের, নানান প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তিনি নিজেকে টেলিভিশনের স্ক্রীনে তুলে ধরছেন শিগগিরই। তারা বলছেন, সমাজ, পরিবার সবকিছু উল্টো পথে হাঁটছিল৷ সব প্রতিবন্ধকতা ভেদ করেই আজকের জায়গা তৈরি করতে হয়েছে তাদের৷ তাসনুভা আনান শিশির, দেশের টেলিভিশনে সংবাদ পাঠের সুযোগ পাওয়া প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নারী। আগামীকাল সোমবার (৮ মা’র্চ)

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বেসরকারি চ্যানেল বৈশাখী টেলিভিশনে সংবাদ পাঠ করবেন তিনি৷ একই দিন চ্যানেলটির একটি নাটকে দেখা যাব’ে আরেক ট্রান্সজেন্ডার নারী নুসরাত মৌ-কে। শুক্রবার সংবাদ বিজ্ঞ’প্ত ির মাধ্যমে বৈশাখী টেলিভিশন এই ঘোষণা দিয়েছে৷ চ্যানেলটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক টিপু আলম মিলন বলেন, ‘‘আমর’া আনন্দের স’ঙ্গে জানাচ্ছি যে, বৈশাখী টেলিভিশন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই বছর, স্বাধীনতার মাস মা’র্চে নারী দিবস উদযাপনের আগে সংবাদ বিভাগ ও নাটকে দুই জন ট্রান্সজেন্ডার নারীকে যুক্ত করেছে৷ দেশের মানুষ এই প্রথম একজন ট্রান্সজেন্ডারকে পেশাদার সংবাদ বুলেটিনে পাঠ করতে দেখবেন৷’’ দৃষ্টান্ত স্থাপনের সেই মুহূর্তের জন্য দুইজনই এখন ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছেন৷ তার মধ্যেই জার্মানির আন্তর্জাতিক সম্প্রচার কেন্দ্র ডয়চে ভেলের কাছে জানিয়েছেন তাদের বাধার পাহাড় ডিঙানোর গল্প৷ নুসরাত মৌ-এর সংগ্রামটা একটু অন্যরকম৷ ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনা করতে পারেননি তিনি৷

চতুর্থ শ্রেণি পেরুতেই বাধ্য হয়েছেন স্কুল ছাড়তে৷ ‘‘আমি যখন স্কুলে যেতাম, তখন আমাকে অন্য শিক্ষার্থীরা খ্যাপাতো, হিজড়া হিজড়া বলতো, টিজ করতো, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতো, এক সাথে বসতে গেলে বেঞ্চ ফেলে দিতো, নানাভাবে হে’নস্থা করতো৷ এ কারণে স্কুলে যাওয়ার মন মানসিকতাটা আর হয়নি৷ একটা পর্যায়ে মনে হলো, সবাই এমন অ’পমান করে, আর স্কুলেই যাব’ো না৷’’ যেভাবে গণমাধ্যমে টেলিভিশনের পর্দায় একই সময়ে অ’ভিষেক হবে দুজনের, যদিও তাদের চলার পথটি ছিল একেবারেই ভিন্ন৷

তবে মিল এক জায়গায়৷ দুজনই বলছেন, তাদের কারো জন্যই এতদূর আসা হঠাৎ পাওয়া কোনো সুযোগ নয়৷ টেলিভিশনে সংবাদ পাঠিকা ‘হতে চললেও শিশির চেয়েছিল নাটকে অ’ভিনয় করতে৷ বৈশাখী টেলিভিশনে গিয়েছিলেন অডিশন দিতে৷ ‘‘চয়নিকা দি (চয়নিকা চৌধুরী) একটি নাটকে কাজ করার জন্য কথা বলছিলেন৷ সেখান থেকে যখন কথাবার্তা হচ্ছিল, তখন ওনাদের নিউজে অডিশন দিতে বললেন৷ আমা’র উচ্চারণ ভালো দেখে বললেন নিউজে কাজ করতে চাই কিনা৷ আমা’রও ভালো লাগা ছিল, আগ্রহের জায়গা ছিল৷

সেখান থেকে অডিশন দিয়ে পুরো যোগ্যতা প্রমাণ করেই আমাকে আসতে হয়েছে, দীর্ঘ যাত্রা পেরিয়ে৷ যেহেতু আগের কোনো কোর্স করা নেই সেহেতু টেকনিক্যাল জায়গাগু’লো বুঝতে হয়েছে৷’’ তবে এই বোঝাপড়ার জায়গায় সহকর্মীদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছেন সেটি তার জন্যে অভূ’ত পূর্ব অ’ভিজ্ঞতা৷ ‘‘এটা আমা’র আরেকটা পরিবার, এখানে কেউ হয়রানি করে না৷ এখানে কেউ আমাকে আঙুল দিয়ে বলছে না আমি অন্য কেউ,’’ বলেন শিশির৷ গণমাধ্যমেই কাজ চালিয়ে যাব’েন কিনা কিংবা ভবি’ষ্যৎ পরিকল্পনা কী- এমন প্রশ্নে জানালেন, খুব বেশিদূর তাকাতে চান না তিনি৷ ‘‘আপাতত পড়োশোনা করছি, পোড়াশোনাটাই করতে চাই৷ ভবি’ষ্যৎ নিয়ে ঐ পরিমান ভাবতে পারিনি এখনও৷ পড়াশোনা শেষ করে হয়ত বুঝতে পারবো কী করা উচিত,’’ বলেন তিনি৷ নুসরাত মৌ অবশ্য গণমাধ্যমেই কাজ চালিয়ে যেতে চান৷

কেননা, শৈশব থেকে এমন স্বপ্নই দেখেছেন তিনি৷ শখ ছিল অ’ভিনয়ের৷ সেই সুযোগ আসে আ ক ম নাসিরুল্লাহ নামে একজনের মাধ্যমে৷ তিনিই তাকে নিয়ে আসেন মঞ্চ নাটকে৷ ‘‘উনি আমাকে মেয়ের মতো দেখেন, ভালোবাসেন৷ উনি আমাকে মঞ্চ নাটকে নেন৷ সেখান থেকে আমা’র অ’ভিনয় দেখে একজনের স’ঙ্গে পরিচয় হয়৷ তার মাধ্যমে মনির হোসেন জীবন ভাইয়েরস’ঙ্গে পরিচয় হয়৷ এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরে আসলে এই কাজের সুযোগ পাওয়া,’’ বলেন মৌ৷ তৃতীয় লি’ঙ্গের মানুষদের জন্য ভবি’ষ্যৎ যেখানেই নিয়ে যাক না কেন দুইজনই তৃতীয় লি’ঙ্গের মানুষের জন্য কাজ করতে চান৷ নুসরাতের ভাবনা নতুন প্রজন্মকে ঘিরে৷

ট্রান্সজেন্ডার হলেও তার মতো যেন কাউকে পড়াশোনা ছাড়তে না হয়৷ সবাই সমান ভাবে যাতে স্কুল কলেজে পড়ার অধিকার পায়৷ তার ভাবনা, ‘‘ভবি’ষ্যতেও তো হিজড়াদের জন্ম হবে৷ তারা কীভাবে বড় হবে? আমি চাই সরকার, সমাজ এমন কিছু একটা করুক যাতে ভবি’ষ্যৎ প্রজন্ম পরিবারের স’ঙ্গে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করে বড় ‘হতে পারে৷ আমা’দের কমিউনিটিতে যেন তাদের আসতে না হয়৷’’ শিশিরের স্বপ্ন তৃতীয় লি’ঙ্গের কমিউনিটির সদস্যদের ভাগ্য পরিবর্তন করা৷

তাদের জন্য একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করা৷ ‘‘তাদের দক্ষতা উন্নয়নে এবং প্রতিটি মানুষকে সা’পোর্ট দেওয়া দরকার৷ আমি শুরু থেকেই তাদের জন্য কাজ করেছি, সেটা সামনেও করবো৷ যে যেই সেক্টরে কাজ করতে চায় তাদের সহযোগিতা করবো,’’ এমনটাই শিশিরের সংকল্প৷ বৈশাখী টেলিভিশন ক’র্তৃপক্ষ তাদের সংবাদ বিজ্ঞ’প্ত িতে উল্লেখ করেছে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ট্রান্সজেন্ডারদের ধা’রাবাহিক ও স্থায়ী উন্নয়নের ধা’রা নিশ্চিত করতে সবার মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি৷ সে-কারণেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে নারী দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে তারা সংবাদে ও নাটকে দুইজন ট্রান্সজেন্ডার নারীকে যুক্ত করছেন৷ এদিন চ্যানেলটির ধা’রাবাহিক নাটক ‘চাপাবাজ’-এর একটি পর্বে দেখা যাব’ে নুসরাত মৌকে, যা প্রচারিত হবে রাত ৮টা ৪০ মিনিটে৷ অন্যদিকে শিশিরকে দেখা যাব’ে বৈশাখীর নিয়মিত সংবাদের উপস্থাপনায়৷

About khan

Check Also

সৃজিতের আস্থার প্রতিদান দিতে চাই: অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন

আজমেরী হক বাঁধন। যাকে নিয়ে নানা সময় নানান গুঞ্জন শোনা গেছে। তবে এবার দীর্ঘদিনের নানা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *