Thursday , December 3 2020
Breaking News
Home / Education / নোবডি থেকে সামবডি হয়ে ওঠা!

নোবডি থেকে সামবডি হয়ে ওঠা!

সুশান্ত পাল
(এ পর্যন্ত মোট ৭০টি ক্যারিয়ার আড্ডায় কথা বলেছি। এগুলির মধ্যে প্রথমটি হয়েছিল চুয়েট ক্যাম্পাসে। (মজার ব্যাপার, ৭০তমটিও হয়েছে চুয়েটেই।) সে আড্ডায় নিচের লেখাটি সবাইকে এক কপি করে দিয়েছিলাম।)
আমি আসলে একজন অ্যাক্সিডেন্টাল ইঞ্জিনিয়ার৷ অ্যাকাডেমিক্যালি৷ একটা সময়ে অনার্স কমপ্লিট করার কোনও ইচ্ছেই ছিল না আমার৷ কেনো অনার্স কমপ্লিট করবো, এর স্বপক্ষে কোনও যুক্তিই ছিল না আমার সামনে৷ আমি তখন বুঝতে পারছিলাম না, সামনের দিনগুলোতে কী করবো৷ আমি ব্যবসা শুরু করেছিলাম৷ খুব ইচ্ছে ছিল, Business Magnet হবো৷ ব্যবসা, বইপড়া, বিভিন্ন ব্লগ এবং ফেসবুকে বন্ধুদের সাথে ভাবনা শেয়ার করা, মুভি দেখা, গান শোনা — এসব নিয়েই বেশ ছিলাম৷ মনে আছে, লাস্ট সেমিস্টারের ফাইনাল প্রজেক্ট ঝুলিয়ে রেখেছি বহুদিন৷ আমার নিজের দোষে, ইচ্ছে করেই৷ আমার প্রজেক্ট সুপারভাইজার সাকী কাউসার স্যার ছিলেন অত্যন্ত প্রস্তরকঠিন হৃদয়ের খুঁতখুঁতে মানুষ৷ আমি আমার বন্ধুদের চেয়ে অন্তত ৪.৫ বছর পর চাকরি করা শুরু করি। ২০১০ সাল। CUET অডিটোরিয়ামে ICT Festival হচ্ছে৷ ’02 ব্যাচের এক্স-স্টুডেন্টর

া কে কোথায় কোন জবে আছে বলছে একে-একে৷ শুধু আমি কিছুই বলতে পারিনি৷ ‘কিছু করা’ বলতে সবাই যা বোঝে তেমন কিছু করতাম না আমি৷ লজ্জায় মনে হচ্ছিল, মরে যাই৷ কী এক সংকোচ! খুব কান্না পাচ্ছে, অথচ কাঁদতে পারছি না, এই অনুভূতিটা অনেক বেশি কষ্টের৷ বিশেষ করে, যখন আশেপাশের সবাই চাইছে, আমি এমন কিছু একটা হয়ে যাই, যা আমি হতে চাইছি না, তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়৷ তেমন কিছু হয়ে যাওয়াটাকে মেনে নিতে পারিনি বলেই আজ আমার এই অবস্থানে আসা৷ ভাবতাম, দিনের শেষে আমাকে তো ‘আমার মতো’ আমি’কে নিয়েই থাকতে হবে, ‘সবার মতো’ আমি’কে নিয়ে নয়৷

আমি আমাকে নিয়ে আমার মতো বেশ ছিলাম। ঘুমানোর সময়টাতে সময় নষ্ট না করে জেগে থাকার সময়টাতে স্বপ্ন দেখতাম৷ কত্তো স্বপ্ন! নানান রঙের, ঢঙের৷ অন্যদের চোখে আমার এক্জিস্টেন্সই ছিল শুধু (তাও ছিল কী?), কোনও এনটিটিই ছিল না৷ হ্যাঁ, আমি এরকমই ছিলাম৷ নোবডি হয়ে৷ তবে নিজের কাছে সবময়ই ছিলাম স্পেশাল, সবাই যেমন থাকে আর কী! পৃথিবীতে নোবডি হয়ে থাকাটা সুখের নয়৷ যে যা-ই বলুক, এটা নিশ্চিত, নোবডি-দের জন্যে এই পৃথিবীতে শুধু নাথিং-ই বরাদ্দ থাকে৷ জীবন আমাদের কোথায় নিয়ে যায়, আমরা কখনও তা ভাবতেই পারি না৷ Life is always stranger than fiction. আমরা অনেকেই জানি, আমাদের সীমাবদ্ধতাগুলো কোথায়৷ অথচ, আমার মনে হয়, আমাদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষই, আমাদের শক্তির জায়গাগুলোকে চিনতে ভুল করি৷ তাই, আমরা সাহস করে বড় কিছু চাইতে পারিনা৷ এমনও তো হয়, ভাল-কিছু’র জন্যে অপেক্ষা করতে ভয় লাগে, অথচ সেই ভাল-কিছু’ই অপেক্ষা করে থাকে আমাদের জন্য৷ ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে এ-ই হয়৷

যা-ই হোক, একসময় মাত্র 2.74 সিজিপিএ নিয়ে কোনরকমে গ্র্যাজুয়েশন শেষ ক’রলাম৷ এরই মাঝে হঠাৎ মাথায় একটা পুরনো ভূত নতুন করে চাপলো — লেখক হবো, দার্শনিক হবো৷ আমার মাথায় মাঝেমধ্যেই ছোটোখাটো ভূত চাপে৷ সেই ভূত বড়ো হয়, মানুষ হয়৷ পুরনো অভ্যেস৷ বিসিএস-এর ব্যাপারে আমার passion এবং feeling কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়৷ বরং আমার অনেক সহযোদ্ধার তুলনায় আমাকে অনেক কম সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে৷ আপনাদের অনেকের মতো আমার একটা সমস্যা ছিল৷ সমস্যাটা হলো, আমি আসলে কী হতে চাই — এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে আমার সময় লেগেছে প্রায় ২০ বছর৷ অথচ, সিদ্ধান্ত নেয়ার পর লক্ষ্যে পৌঁছতে আমি সময় নিয়েছি মাত্র কয়েক মাস৷ সিদ্ধান্তই আপনার বর্তমান অবস্থান এবং ক্যারিয়ারের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে দেয়৷ ৩০তম বিসিএস পরীক্ষার সার্কুলার হওয়ার কয়েকদিন আগে আমার দুই বন্ধুর কাছ থেকে বিসিএস সম্পর্কে জানলাম৷ সেইদিন আমার বিসিএস-এ প্রথম হাতেখড়ি৷ আমার এখনও মনে আছে, অনেক ভাল লেগেছিল সেদিন৷

কেন জানি বারবারই মনে হচ্ছিল, আমার স্বপ্নের পালাবদল হওয়ার সময় এসেছে; সাথে অবশ্য লেখক হওয়ার ঝোঁকটাও ছিল৷ সিভিল সার্ভিসে জয়েন করলে লেখক হওয়াটা সহজ হবে — এমনটা মনে হয়েছিল৷ একটা কথা পর্যন্ত আপনার জীবনের মোড় বদলে দিতে পারে, রীতিমতো U-turn-এ! আমার স্বপ্নযাত্রা শুরু হলো৷ আমার জীবনের ছোট-বড় যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমার মা-বাবা এবং ছোটভাইয়ের সমর্থন পেয়েছি সবসময়৷ পরিবার পাশে থাকলে মনের জোর অনেকটাই বেড়ে যায়৷ আমি মন থেকে যা কিছু চাই, তা কিছু আমার কাছে দুনিয়ার সমস্ত চাওয়ার চাইতেও বড়ো৷ পথের চাইতে অন্য-পথ নিয়ে খেলতে আমি বরাবরই শিহরণ বোধ করেছি৷ ভেবেছি, ওটাও তো একটা পথ৷ আর দশজন কোনওকিছুকে ভুল বললেই সেটা ভুল হয়ে যায় না৷ এমনও তো কিছু ভুল থাকে যেগুলো করতে না পারার আফসোসেই জীবন কেটে যায়৷ স্রেফ কম্প্রোমাইজ করেই জীবনটা কাটিয়ে দিলে বাঁচবোই বা কখন? মৃত্যুর আগেই যে করেই হোক একটু হলেও বাঁচতে হবে৷ জীবনটা তো কোনও ইউজার ম্যানুয়েল নিয়ে আমাদের কাছে আসেনি৷ এতো দায় কীসের তবে? একটু-আধটু এক্সপেরিমেন্টালই হলাম না হয়! এইসব ভাবতাম৷

জীবনটা যেন পৃথিবীর সমস্ত দূরপাল্লার দৌড়বীরদের জুতোর মতন৷ তাকে ছোটাতে হয়৷ তবু জীবন মাঝে-মাঝে থমকে যায়৷ মুক্তি অনিশ্চিত জেনেও মুক্ত হওয়ার আকুতি — যতটা অনর্থক, ততটাই তীব্র ৷ নাম-পরিচয়হীন থাকার যে কী যন্ত্রণা, সেটা আমি খুব ভালভাবে বুঝি৷ সাফল্যের জন্যে আত্মবিশ্বাস জরুরী, নাকি আত্মবিশ্বাসের জন্যে সাফল্য জরুরী — এই দ্বন্দ্বে কেটেছে বহুদিন৷ আফসোস ছাড়া বেঁচে থাকাটাই সাফল্য, এটা ভাবতাম সবসময়ই৷ আমার সেই কষ্টের দিনগুলোর কথা বেশ মনে আছে৷ আমার চিন্তা-ভাবনা, কাজ — সবকিছুকেই আমি এককেন্দ্রিক করে ফেলেছিলাম — আমার স্বপ্নকেন্দ্রিক৷ ধুলোর ঝড়ের মধ্যে চোখ বন্ধ করে হাঁটাটা যতটা বিপত্তিকর, তার চেয়েও অনেক বেশী কষ্টের, যখন দেখি, ঝড় থেমে গেছে, অথচ শুধু হাঁটতে শিখিনি বলেই যে পথে অনেকেই হেঁটে গেছে, সে পথ আমার আর পেরুনো হল না৷ ফিনিক্স পাখির উপমা যদি বেশি বাড়াবাড়ি মনে না হয়, তাহলে বলা যায় যে এ পাখির মতনই আমাদের স্বপ্ন বারবার মরে এবং বাঁচে৷ স্বপ্নেরা কখনও-কখনও ভেঙে যায়, দূরে ভেসে হারিয়ে যায় না৷ কখনও, নিজের অস্তিত্বকেই অতিথি মনে হয়৷ যে অন্ধকারের মধ্যে ডুবে আছি তাকে নিয়েই গান গাইবার বড্ড সাধ হয়৷ ভেতরের ক্লান্ত ‘আমি’টা বিদ্রোহ করে যেন, আমি ওকে থামিয়ে দিই—সচেতনভাবেই৷ কোনও কাজ করতে গিয়ে আপনার যদি অন্তত পাঁচ-ছয়’বার মনে না হয়, এই কাজটা আমাকে দিয়ে হবে না, আর পারছি না, এইবার ছেড়ে দিই, তাহলে ধরে নিতে পারেন, কাজটা আপনি এখনও শুরুই করতে পারেননি৷

কথাটা বোধ হয় শাহরুখ খানের৷ মাঝে মাঝে নিজের ভেতরটা বিদ্রোহ ঘোষণা করত, বেঁকে বসত; তবু নিজের সাথে যুদ্ধ করেছি সবসময়৷ আমি নিজেকে প্রায়ই বলতাম, If you are not thinking about your dream, you are not thinking at all. ভেবেছিলাম, বুঝি হারিয়েই যাবো! কঠিন সময়ের স্রোতে শুধু কঠিন মানুষগুলোই টিকে থাকে — এই বোধটুকু কাজ করত সবসময়৷ নিয়তি সহায় হয়েছে৷ আমি হারাইনি! এখনও মনে আছে, ৩০তম বিসিএস পরীক্ষার রেজাল্টের জন্য আমরা সবাই বেশ কিছুদিন ধরেই অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম৷ অবশেষে রেজাল্ট বের হল৷ তারিখটা ছিল ২ নভেম্বর৷ সেদিন ছিল আমার জন্মদিন৷ কী অদ্ভুত, তাই না? আনন্দে আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল৷ জীবনে এইবারই প্রথম সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে অনেক বড় একটা birthday gift পেলাম৷ ব্যাপারটাকে আপনারা স্রেফ মিরাকল কিংবা কাকতালীয়, যা-ই বলুন না কেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, Miracles happen when you believe. হ্যাঁ, মিরাকল ঘটে! আমি সবসময়েই আমার স্বপ্নের প্রতি sincere থেকেছি; তাই বোধ হয়, আমার স্বপ্নও শেষ পর্যন্ত আমার প্রতি sincerity দেখিয়েছে৷ স্বপ্ন এবং বাস্তবতার এই যে mutual interaction — এটা সত্যিই বেশ দারুণ! আপনার স্বপ্ন নির্মাণ করুন৷ তাকে স্পর্শকের স্পর্ধায় ছুঁয়ে ফেলার শপথ নিন৷

সামনের দিনগুলোতে কী করলে সুন্দর একটা ক্যারিয়ার (‘সুন্দর’ মানে লোকে যেটাকে সুন্দর বলে আর কী!) গড়তে পারেন, এটা নিয়ে ভাবছেন অনেকেই৷ আমি বলবো, এটা নিয়ে ভাববার আগে, নিজেকে জিজ্ঞেস করে নিন, কী আপনার ভাল লাগে৷ অন্যেরা এর উত্তর দিতে পারবে না৷ ওরা বড়োজোর জানে, কী আপনার ভাল লাগা উচিত৷ অন্য দশ জনের মতো করে ভাববার মস্তো বড়ো অসুবিধে হচ্ছে এ-ই, আপনি আসলে যতোটুকু করার ক্ষমতা রাখেন, সেটা একটা বাঁধাধরা ছকে পড়ে যায় এবং আপনার অ্যাচিভমেন্ট এমন কিছু হয় না, যেটাকে আলাদা করে বলা যায় কিংবা দেখা যায়৷ আপনার জীবনটাকে আপনি গড়পড়তায় ফেলবেন কিনা, It’s your choice.

নেলসন ম্যান্ডেলার একটা কথা আছে: It always seems impossible until it’s done. একটা সময়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় যারা ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়, তাদেরকে আমার এ্যালিয়েন টাইপের কিছু মনে হতো৷ ভাবতাম, ওরকম হওয়া সম্ভব নয়৷ পরে আমি সেই পরীক্ষায় প্রথম হয়েছি৷ যারা আইবিএ’তে চান্স পায় তাদের প্রতি কী এক মোহ আর শ্রদ্ধাবোধ কাজ করতো৷ সেসব কথা মনে হলে এখন হাসি পায়৷ সবাই যেটাকে কঠিন বলে, সেটা করার জন্য আমি মন থেকে সবসময়ই একটা তাগিদ বোধ করি৷ এই পৃথিবীতে কোনকিছুই ডিজার্ভ করা যায় না, সবকিছুই আর্ন করতে হয়৷ আপনি যা চাইছেন, তা পাওয়ার জন্য সেটার প্রতি প্রচণ্ড শ্রদ্ধাবোধ আর ভালোবাসা থাকতে হবে৷ যারা সেটা পেয়ে গেছেন আগেই, তাদের ভাল দিকগুলো নিজের মধ্যে রেপ্লিকেট করতে হবে৷ প্রয়োজনে নিজেকে কিছুটা ভেঙেচুরে নতুন করে তৈরী করতে হয়৷ এক অন্ধ অন্য এক অন্ধকে রাস্তা দেখাতে পারে না৷ তাই এই সময়ে যতটুকু সম্ভব অসফল লোকদের এড়িয়ে চলুন৷ ওদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া সহজ, কারণ অসফল হওয়াটা সহজ৷ ওদের জীবনদর্শন বেশিরভাগ সময়েই খুব স্বাচ্ছন্দ্য দেয়৷ নিজের মতো কিংবা আরও বেশি অপদার্থ লোকের সাথে থাকতে কার না ভাল লাগে? নিজেকে চ্যালেঞ্জ করতে জানাটা একটা মস্তো বড়ো আর্ট৷

ফেসবুকে অপদার্থের ফ্রেন্ড হওয়ার চাইতে জ্ঞানীর ফলোয়ার হয়ে থাকাও ভাল৷ মাঝেমাঝে নিজেকে কষ্ট দিতে হয়৷ নিজেকে কে না ভালোবাসে? সবাই ভাবে, সে দেখতে শাহরুখ খানের মতো, অন্যেরা যা-ই ভাবুক৷ তাই যখন নিজের অসহায়ত্ব নিজের অস্তিত্বকে পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়, সবার চোখে অপাংক্তেয় ক’রে তোলে, মা-বাবা, ভাই-বোন’কে আত্মীয়-স্বজনের কাছে ছোট হতে হয় প্রতিনিয়তই, বন্ধু-বান্ধব কেমন যেনো দূরে সরে যায়, তখন প্রচণ্ড অভিমানে নিজের সবটুকু দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে৷

জীবনের প্রয়োজনে কঠিন মৃত্যুতেও অভ্যস্ত হওয়া যায়৷ আরও একটা ভুল অনেকেই করে থাকে৷ সেটা হলো, খুব সফল কারও কাছ থেকে অন্য কোন ব্যাপারে সাফল্যের ফর্মুলা নিতে যাওয়া৷ সফল অনেকেই আছে, যারা জানে যত কম, বলে তত বেশি৷ তারা ভাবে, কোনও এক বিষয়ে সফল হয়েছে বলে দুনিয়ার যাবতীয় ব্যাপারে মতামত দেয়ার অধিকার তাদের হয়ে গেছে৷ বিল গেটসের কাছে চাল-ডালের ব্যবসার আইডিয়া চেয়ে কী লাভ? আরও একটা ব্যাপার শেয়ার করি৷ যতই সফল হোক না কেনো, এমন কারও কাছে ঘেঁষবেন না যে আপনার মনোবলকে ভেঙে দেয়৷ শুধু ভুলই ধরিয়ে দেয়, এমন লোকের কাছ থেকে আসলে কিছু শেখা যায় না কিংবা শিখলেও সেটাকে ওরাই কাজে লাগাতে দেয় না৷ If you cannot help a person to do something, you have no right to demoralize him/her saying that he/she cannot do it. কিন্তু, এটাই অনেকে করেন। আবার অনেকেই আছেন যারা নিজে যা পাননি, ধরেই নেন বাকিরাও সেটা পাবেন না; উনাদের পরামর্শগুলো শুনলে লেজকাটা শেয়ালের গল্প মনে পড়ে যায়।

বাচ্চা খেতে চায় না, এটা কোনও কথা না; যুগেযুগে বাচ্চারা খেতে চায়নি, এই পৃথিবীতে কোনওকালেই কোনও রাক্ষস টাইপের বাচ্চার জন্ম হয়নি, ভবিষ্যতেও হওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখি না, তবুও তো মা-বাবা কতো বুদ্ধি বের করে বাচ্চাকে খাওয়ান; বাচ্চাকে কীভাবে খাওয়ানো যায়, সেটা তো জানতে হবে। তাই, আপনি কিছু একটা করতে পারবেন না, এমন কথা ক্যারিয়ারের শুরুতে কাউকেই বলতে দেবেন না, এমন কী আপনার বাবা-মা’কেও নয়৷ যারা আপনার ভাল কাজের প্রশংসা করে না, শুধু খারাপ কাজের সমালোচনা করে, তারা আর যা-ই হোক, আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী অন্তত নয়৷ বন্ধু তো নয়-ই৷ তারা আপনার পাশে থাকা না-থাকা, দুই-ই সমান৷ ওদের যত পাত্তা কম দেবেন, ততই ভাল থাকবেন৷ ওরকম দু’একটা ফালতু লোককে ছুঁড়ে ফেলে দিন৷ প্রশংসা করতে বড়ো মন লাগে৷ যে কখনও প্রশংসিত হয়ইনি, সে আপনার প্রশংসা করবে কীভাবে? এসব ভাইরাস থেকে দূরে থাকুন, সুস্থ থাকুন৷

একটু ভেবে দেখুন তো, টেন্ডুলকারের সেঞ্চুরির হিসেবটা আমরা যতটা রাখি, ততটা খোঁজ নিয়েছি কি কখনও, সেঞ্চুরি হাঁকাতে গিয়ে কতটা ফিজিক্যাল এবং মেন্টাল স্ট্রেস উনাকে নিতে হয়? যতক্ষণ ব্যাটিং করেন, ততক্ষণই কত কোটি মানুষের এক্সপেক্টেশনের সমস্ত টেনশন সাথে নিয়ে নিজের সবচে’ ভালটুকু দেখাতে হয়? আমাদের কতটুকুই বা এক্সপেক্টেশনের প্রেসার নিতে হয়? খুব বেশি হলে, দশ জনের? যে ভাল খেলে সে-ই জানে, ভাল খেলতে কী কষ্ট হয়৷ কতটা নার্ভ-টেস্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়৷ ক্রিকেট নিয়ে আরও ভাল হয়তো অনেকেই জানেন, তবুও এখানে শুধু জানাটা ইম্পর্টেন্ট নয়, জানাটাকে কাজে লাগানোই ইম্পর্টেন্ট৷ আপনি কী পারেন, আর কী পারেন না, আপনার কাজই তা বলে দেয়৷ এক্ষেত্রে সিরিয়াস হওয়ার চাইতে সিনসিয়ার হওয়াটা বেশি জরুরি৷ Work hard — শুধু এই পুরনো স্লোগান নিয়ে বসে থাকার দিন শেষ; এর সাথে এখন যুক্ত হয়েছে Work smartly.

সবাই তো আর সবকিছু পারে না৷ যে যা পারে না, তা করতে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে Average People-এর দলে মিশে যায়৷ অনার্স পড়ার সময় যে গ্রুমিংটা আপনাদের হয়েছে, সেটা ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে ক্যারিয়ারটাকে নিজের মতো করে গড়ে নেয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র৷ স্টিভ জবস্ একটা চমৎকার পরামর্শ দিয়েছিলেন, Stay foolish, stay hungry. একটা টিভি অ্যাডের কথা মনে পড়ে গেলো। চকোলেটের অ্যাড। একটা চকোলেট নিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন মন্তব্য করছে। কেউ বলছে চকোলেটটা ভাল, কেউবা বলছে খারাপ, কেউকেউ কনফিউসড্। একজন কিছুই বলছে না। মুখ বন্ধ। সবাই জিজ্ঞেস করলো, কী ভাই, কিছু বলছেন না কেনো? উনি কোনওরকমে মুখ খুলে উত্তর দিলেন, ভাই, বলবো কীভাবে? আমি তো খাচ্ছি! ……. এটা আমার দেখা সেরা অ্যাডগুলোর একটা। যারা পারে, তারা হৈচৈ কম করে। When you are in the shit, keep your mouth shut. ক্যারিয়ারে সাফল্য লাভ করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বোকা থাকুন, এর জন্য ক্ষুধার্ত থাকুন, প্রস্তুতি নিন, চোখ-কান খোলা রাখুন; মুখ নয়৷ Que sera sera — Whatever was, was; whatever is, is; whatever will be, will be. যা হবার তা হবেই। আপনাদের এই গানহীন অন্ধকার দিনগুলো নিয়ে একদিন গান হবে৷ সেদিনের অপেক্ষায় থাকলাম৷ সেদিন, আমার এই কথাগুলো পড়েছিলেন, ব্যাপারটাকেই মনে হবে স্রেফ ছেলেমানুষি৷

বিসিএস আর আইবিএ ভর্তি পরীক্ষার বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজি আমার আজকের প্রেজেন্টেশন থেকে সংগ্রহ করে নেবেন। এরপর নিজের মতো করে সেগুলোকে কাজে লাগাবেন। এখন আমার নিজের জীবন থেকে শেখা আরওকিছু লেসন শেয়ার করছি।
কোনও এক সন্ধ্যায় আমার ছোটো ভাইয়ের সাথে কথা বলে মনে হলো, সে প্রচণ্ড হতাশায় ভুগছে, হাল ছেড়ে দেবে-দেবে করছে৷ এইরকম অবস্থায় মানুষ ভাবে, সে খুব একা, সবাই তার চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে; খুব কাছের যারা, তারাও তার বন্ধু নয়৷ সে ভাবতে শুরু করেছিল, শুধু বেঁচে থাকাটাও কী ক্লান্তিকর! সবাই তার শত্রু৷ তাকে কেউই ভালোবাসে না৷ যাকে কেউ চায় না, সে কীভাবেই বা থাকে! আমি আশা এবং নিরাশা দুটোরই চরম সীমানায় থেকেছি। আমি জানি, সামনে যখন শুধুই শূন্যতা থাকে তখন কেমন লাগে। কতটা আশায় মানুষ স্রেফ বেঁচে থাকে, তাও জানি। লাইফ অব পেন্যান্স কী, তা আমাকে কোনও থিওসোফিক্যাল লেকচার পড়ে শিখতে হয় নি৷ খুব কষ্টে আছেন, এর চেয়ে বেশি কষ্টে থাকা যায় না, এইরকম দাবি যাঁদের, তাঁদের বলছি, একটা সময়ে মৃত্যুর প্রহর গোনার ব্যাপারটা পর্যন্ত আমার কাছে বিলাসিতা মনে হতো৷ ওরকম প্রহর গুনতে হলে তো অন্তত বেঁচে থাকতে হয়; সেই বেঁচে থাকাটাও কী এক ভীষণ যন্ত্রণার বিলাসিতা!

আমি দেখেছি, শুধু বেঁচে থাকলেও অনেককিছু হয়৷ হারিয়ে গেলে, খুব কাছের মানুষ ছাড়া কারওরই কিছু এসে যায় না৷ তাই, বেঁচে থাকুন। আপনার মৃত্যু কিছু লোককে দারুণ অস্বস্তিতে ফেলে দেবে, যারা আপনার মৃত্যুকামনা করে স্বস্তি পায়। অন্তত তাদের কথা ভেবে হলেও . . . . . . . বাঁচুন!
বেঁচে থাকাটাই সবচে’ বড় প্রতিশোধ। তাই, অন্তত নিজের কথা ভেবে হলেও . . . . . . . বাঁচুন!
বাঁচুন, নিজের জন্য। বাঁচুন, অন্যের জন্য।

About khan

Check Also

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগঃ (Corona virus) নিয়ে সাম্প্রতিক প্রশ্ন উত্তর

Corona virus)সাম্প্রতিক প্রশ্ন (#collected) ১) করোনা ভাইরাস কত সালে আবিষ্কার হয়? উঃ ১৯৬০ ২) কোভিড-১৯ ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page