Friday , September 18 2020
Breaking News
Home / Education / বিসিএস পরীক্ষা, সিভিল সার্ভিস ও বাস্তবতা

বিসিএস পরীক্ষা, সিভিল সার্ভিস ও বাস্তবতা

ইদানীং বিসিএস পরীক্ষা একটি জোরালো আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। চাকরির সন্ধানে যুবসমাজ বিসিএস পরীক্ষার দিকে প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়েছে। আগে কি এদেশে বিসিএস নামক কোনো পরীক্ষা ছিল না বা তার আগে সিএসএস, তারও আগে আইসিএস, এমন কোনো কিছু? নিশ্চয়ই ছিল। একজন স্বদেশি আইসিএসকে তখন ভারতীয় মনে না করে ইংরেজরূপে কল্পনা করা হতো। পাকিস্তান আমলে সিএসপিদের বলা হতো প্রশাসনের রাজপুত্র।

ব্রিটিশ শাসনামলে ব্যক্তিগত খাতে কোনো পুঁজির বিকাশ ঘটেনি। পুঁজি বলতে যা বোঝায় তা ছিল রাষ্ট্রীয় পুঁজি। ব্যবসা-বাণিজ্য যা ছিল, তা ছিল একান্তভাবে ইউরোপিয়ানদের হাতে। অতএব ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, সরকারি চাকরির দাম ছিল অনেক উঁচুতে। প্রবাদবাক্যের মতো উচ্চারিত হতো চাকরি মানে ঘি-ভাত। তবে চাকরির বাজারে ভারতীয়দের অবস্থান ছিল নিচের দিকে। কর্মকর্তাদের মধ্যে ডেপুটি সেক্রেটারির ঊর্ধ্বে ভারতীয়দের খুঁজে পাওয়া যেত না। লিয়াকত আলী খান যখন অর্থমন্ত্রী, তখন গোলাম মোহাম্মদ নামে একজন পাঞ্জাবি ছিলেন ডেপুটি সেক্রেটারি। পরবর্তীকালে এই গোলাম মোহাম্মদ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হয়েছিলেন। প্রশাসননির্ভর ব্রিটিশদের শাসন ভারতবর্ষের উৎপাদন ও উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি।

তখন ইন্ডিয়ার সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে বলা হতো, তারা , তাদের বেশিরভাগ কর্মকর্তা ইংরেজ ছিল, ভারতীয় নয়। তারা মোটেও সিভিল নয়, তাদের অনেকেই ছিলেন অত্যন্ত উদ্ধত স্বভাবের, এদের মধ্যে সার্ভিসের লেশমাত্র ছিল না। তারা সেবা করত না, প্রজাদের শাসন করত। ভারতীয়দের মধ্যে কে কখন আইসিএস হয়েছিলেন, এটা আজ একবারে নগণ্য ব্যাপার। ভারত থেকে অবসরগ্রহণ করে ইংরেজ আইসিএস অফিসাররা যখন স্বদেশে ফিরে যেত, তখন তাদের নবাব বলে সম্বোধন করা হতো।

একদা যে কারণে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল, সেই একই কারণে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেরও পতন ঘটে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, গান্ধীজির আন্দোলনের ফলে কি আপনাদের ভারত ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে? তখন এটলি উত্তর দিয়েছিলেন মোটেই নয়। ভারতবর্ষে আমাদের উপনিবেশ ধরে রাখতে যে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন- তাদের বেতন-ভাতা দেয়ার ক্ষমতা এখন আর আমাদের নেই। বস্তুত, গান্ধীজির আন্দোলনের জন্য নয়- হিটলারের বিমানবাহিনীর প্রলয়ংকর বোমার আঘাতে ব্রিটিশরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে ব্রিটিশকে তার কলোনিগুলো ছেড়ে দেশে ফিরে যেতে হল। সুযোগ্য আমলা, বাঘা বাঘা আইসিএস মাথাভারি প্রশাসন ব্রিটিশদের আসল বিপদের সময়ে যথাযথ কোনো কাজে লাগল না। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই কথা সমভাবে প্রযোজ্য।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তিনটি এবং কৃষি ও বুয়েটকে নিয়ে মোট পাঁচটি। বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছিল পাকিস্তানের শেষের দিকে মাত্র চারটি। এখন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ মিলে দেশ-বিদেশে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী অধ্যয়নরত। প্রাচীনযুগ, মধ্যযুগ ও বর্তমানের শিক্ষা এক নয়। বিদগ্ধজনের মতে, ওই সময়ের শিক্ষার সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক ছিল দুর্বল। তখন শিক্ষকদের নিুকর্মা মনে করা হতো। আর আজকাল উপযুক্ত শিক্ষকই পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে।

২০১৫ সালে সরকার নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করে আর চাকরির সন্ধানে উৎকণ্ঠিত যুবসমাজ এ পে-স্কেল দেখে বগল বাজাতে শুরু করে। তখন থেকেই অধিকসংখ্যক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ তাদের চিকিৎসা শাস্ত্র, প্রযুক্তি জ্ঞান ও কৃষিবিদ্যাকে দূরে ঠেলে ফেলে বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার স্বভাবতই তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, এমন হলে বিশেষায়িত খাতগুলোর কী হবে? বিশেষায়িত খাতগুলো যেমন আছে, তেমনি পড়ে থাকবে না? গবেষণার ক্ষেত্রে নিত্যনতুন ‘অভিজিৎরা’ দুনিয়া কাঁপানো গবেষণার দ্বারা সাড়া জাগিয়ে তুলবে। বিশ্ববাজারে গবেষণার চাহিদা ব্যাপক এবং বিস্তৃত। অন্যদিকে যারা বিশেষায়িত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এখন ক্যাডার কর্মকর্তা হতে চাচ্ছেন; দু-চার বছর চাকরি করার পর তাদের সেই অর্জিত বিদ্যাও তারা ভুলে যাবে। আমলার চেয়ারে বসে জোর করেও বড় ডাক্তার বা বড় ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যায় না। আলী ইমাম মজুমদার সাহেবের মতো প্রফেসর ছালামও কথাটিকে অন্যভাবে ঘুরিয়ে বলেছেন; তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যায় যদি নতুন গবেষণা না হয় তাহলে বিজ্ঞান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কালোদিন ঘনিয়ে আসবে। মাবনজাতির এই পৃথিবীতে আগমনের পর থেকে তার টিকে থাকার জন্য গবেষণা চলছে এবং শেষ দিন পর্যন্ত চলবে। গবেষণা না থাকলে দুর্দিন আসবে না- এমন নয়।

যা হোক, ১৯০ বছরে ব্রিটিশরা যে অর্থনীতির পরিবর্তন আনতে পারেনি; ২৩ বছরে পাকিস্তানিরা যা করতে পারেনি, তা সম্ভব হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে। মার্কিন ও জাপানিদের দৃষ্টিতে বড় অর্থনীতি সৃষ্টির মেরুদণ্ড এসএমই খাত। লাল ফিতার এই দেশে জনগণ কর্ম ও প্রযুক্তির প্রেরণায় নবউদ্যোমে জেগে ওঠে। সরকারি চাকরির প্রতি সাম্প্রতিক এ ঝোঁক সৃষ্টির অন্য একটি কারণ রয়েছে। হাল আমলে বেসরকারি চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বন্যা-বাদলে মহামারীতে তার ওপর প্রভাব পড়ে। এর কোনোটাই সরকারি চাকরির ওপর প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। সিডর, আম্পান, আইলা, তাকে কাত করতে পারে না।

ভারতীয় প্রাচীন অর্থনীতিবিদ চানক্যের মতে, মাছ যখন পানি খায় এটা যেমন দেখা যায় না, তেমনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যখন ঘুষ খায় তাও দেখা যায় না। অতএব বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পেলে তারপর ৩০ থেকে ৩৫ বছর নিশ্চিন্তে প্রজাতন্ত্রের প্রজাদের ঘাড়ে চেপে এ দীর্ঘ সময়টা পার করা যাবে। চাকরি থেকে অবসরগ্রহণ করার পরেও সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত থাকবে। বাংলার গভর্নর হাবার্ট থেকে পাকিস্তানের আজিজ আহমেদ এবং হাল আমলের কুড়িগ্রামের ডিসি এরা সবাই সাধারণ মানুষের আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে তাদের একাত্ম হওয়াটাকে মর্যাদা হানিকর বলে মনে করে। এত বড় উচ্চপদে আসীন কর্মকর্তাদের মানসিক হীনমন্যতা, দার্শনিক নৈরাজ্য ও অদূরদর্শিতা যে কত বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে, তা দেখার জন্য আজিজ আহমেদও বেঁচে নেই- সেই পাকিস্তানও টিকে নেই।

পরিশেষে বলতে হয় ‘এখনি অন্ধ, বন্ধ কোরনা পাখা’। এবার মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যুবসমাজ যে সহযোগিতা-সহমর্মিতা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে তাও ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শুধু তারা ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেনি- মরা মানুষের দাফনেরও ব্যবস্থা করেছে। রোগাক্রান্ত অসুস্থ মানুষগুলোকে নিয়ে ডাক্তার, নার্স, জেলা প্রশাসন, সশস্ত্রবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার বাহিনী যে পরিশ্রম করেছে- এ সবকিছু দেখে একসময় ওয়ারেন হেস্টিংস মন্তব্য করছিলেন, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বাংলার মানুষের মধ্যে এক অসীম সাহস ভর করে, যা শুধু দূরপ্রাচ্যের মানুষের সঙ্গে তুলনা করা যায়। দুঃখ হয় ’৭৪-এ এটি সম্ভব হল না কেন? তখন খাদ্যের অভাব ছিল এ কথা সত্য নয়। ’৭৩-এর চেয়ে ’৭৪-এ খাদ্য মজুদ বেশি ছিল। সেই বাংলাদেশ আজ আর নেই। এখন আর ‘ভুক নাগছে মা একনা ভাত দাও’ বলে দ্বারে দ্বারে কেউ করাঘাত করে না। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখতে। বাংলাদেশ এখন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সমৃদ্ধ দেশ হওয়ার পথে।

এহসানুল কবির : প্রাবন্ধিক ও রাজনীতিক

About Dolon khan

Check Also

টিউশনির পাশাপাশি চাকরির প্রস্তুতিতে ‘গ্রুপ স্টাডি’ বেশি কাজে দিয়েছে

২০০৬ সালে শরীয়তপুরের আব্বাস আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে চাঁদপুরের আল-আমিন একাডেমি ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *