Breaking News
Home / Education / ভ্যানচালকের পুত্র বিসিএস ক্যাডার

ভ্যানচালকের পুত্র বিসিএস ক্যাডার

রিক্সা চালক বাবার, ভ্যান চালক ছেলে আজ দেশের প্রথম শ্রেণীর সরকারী গেজেটেড চিকিৎসক। গত মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত গেজেট অনুযায়ী- ৩৯তম বিসিএসে উত্তীর্ণ ৪ হাজার ৪৪৩ জন ভাগ্যবান চিকিৎসকের একজন ডা. আল মামুন। তার পিতার নাম খোরশেদ আলম। মাতা শরিফা বেগম। প্রাইমারি স্কুল সম্পন্ন করেছেন পশ্চিম হাসলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মানিকগঞ্জ সদর থেকে। হাই স্কুলে পড়েছেন লেমুবাড়ী বিনোদা সুন্দরী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকগঞ্জ সদরে। দরিদ্র কোটায় বিনা খরচে এইচএসসি সম্পন্ন করেন ঢাকার ক্যামব্রিয়ান কলেজ থেকে। এরপর ভর্তির সুযোগ পান ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ, ২০ তম ব্যাচে।

গেজেটে নিজের নাম দেখে আবেগে আপ্লুত ডা. আল মামুন। জানিয়েছেন নিজ অনুভূতির কথা। বলেন, ছোট বেলা হতেই অনেক প্রতিকূলতার মাঝে, দরিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে লেখাপড়া চালিয়ে এসেছি। ২ ভাই ও ২ বোনের মাঝে আমিই বড়। যেখানে আমার গ্রামে ডাক্তার বলতে ওষুধের দোকানদারকেই বুঝে,, সেই গ্রাম হতে আমি আল্লাহর অশেষ রহমতে আজ সরকারী ভাবে ৩৯ তম বি সি এসের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ক্যাডারে গেজেটেড হলাম।

ডা. আল মামুন বলেন, চড়াই উতরাই করে স্বপ্ন পরিবর্তন হতে থাকে আমার। সেই যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি, তখন চাইতাম স্কুলের প্রধান শিক্ষক হবো। যখন হাই স্কুলে গেলাম তখন চেয়েছি হাই স্কুলের শিক্ষক হবো। যখন ৫ম শ্রেণীতে উঠি তখন হঠাৎ আমার মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাড়িতে রান্না হতে শুরু করে ছোট ভাই বোনদের লালন পালনের দায়িত্ব আমাকেই পালন করতে হতো। মা প্রায় ৪ বছর অসুস্থ ছিলেন। তাই মা বাবা মাঝে মাঝে আমাকে বলেন, তাদের ছেলে এবং মেয়ে,, দুটাই আমি।

হাইস্কুল জীবনে কত দিন যে ভ্যান চালিয়েছি, মানুষের বাড়িতে কামলা খেটেছি তার হিসাবটা হয়তো মিলাতে পারবো না। ছোট বেলা হতেই দেখে এসেছি বাবা রিক্সা চালান, কত কষ্ট করে আমাদের পড়াশোনা করিয়েছেন। মানুষে অনেক কথাই বলেছেন, তবুও বাবা দমে যাননি। তার স্বপ্ন, ছেলেকে পড়াশোনা করাবেন।

আমার মনে আছে, যখন SSC পরীক্ষা দিবো তখন বোর্ডের ফিস জোগার করতে পারিনি। আমাদের উপজেলার সন্মানিত চেয়ারম্যান সাহের সে ফিসের টাকা দিয়ে দিলেন। প্রাইভেটও তেমন পড়তে পারিনি। যতটুকু পড়েছি শ্রদ্ধেয় স্যাররা ফ্রি পড়িয়েছেন। স্যারদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা সব সময়।

SSC পরীক্ষার পরে যখন রেজাল্টের পূর্ব পর্যন্ত বন্ধ পেলাম তখন আমি খুব ভালো ভ্যান চালক! বিভিন্ন জায়গা হতে কাঁচা সবজী, তরকারি কিনে এসে হাটে বিক্রি করতাম। এর পরে হঠাৎ এক দিন SSC এর রেজাল্ট বের হলো পেলাম Golden A+. আমার স্কুল হতে, আমার ব্যাচই প্রথম A+ পেল। স্যাররাও খুব খুশি। কিন্তু এর পরে কোথায় ভর্তি হবো, কি করবো? কিছুই জানি না।

এর মাঝে এক দিন হঠাৎ গ্রাম সম্পর্কিত এক দাদুর কাছে শুনতে পেলাম ঢাকার ক্যামব্রিয়ান কলেজে গরীব মেধারীদের কয়েক জনকে ফ্রি পড়াবে। সেই দিন ঐ দাদুর সাথে প্রথম ঢাকা আসলাম। এটাই প্রথম ঢাকা আসা আমার। ঢাকায় এসে দাদুকে প্রশ্ন করেছিলাম,, দাদু, রাস্তার দু পাশে এতো তার কেন!!?

যাই হোক, ক্যামব্রিয়ান কলেজে নিয়ে গেলেন আমার গ্রাম সম্পর্কীয় এক কাকা। ভর্তি করে দিলেন সম্পূর্ণ বিনা বেতনে ২ বছর পড়ার সুযোগ পেলাম। কিন্তু বাঁধা সাজলো, আমারতো থাকার জায়গা নেই ঢাকাতে। ঠিক তখন সেই আমার গ্রাম সম্পর্কীয় কাকা বললেন, আমার বাসায় থেকে পড়াশোনা করবি। যার ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারবো না। ২টা বছর তার বাসায় থেকে পড়াশোনা করেছি, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছি।

একটি কথা না বললেই নয়। যখন ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে চান্স পেলাম তখন ভর্তি হবার টাকা নেই আমার কাছে। ভর্তি হবার জন্য ৬০০০ টাকা দিলেন আমার এক গ্রাম সম্পর্কীয় আরেক দাদু। মেডিকেলে ভর্তি হবার পরে,, ফরিদপুর অনেক টিউশনি করা শুরু করলাম। সে টাকা দিয়ে আমি চলতাম সাথে বাড়িতে ভাই-বোনদের জন্য পাঠাতাম। আমার দু বোনকে সরকারীভাবে নার্সিং এ ডিপ্লোমা পড়িয়েছি। তারা এখন দু জনেই ঢাকাতে চাকরী করেন। ছোট ভাই এবার SSC পরীক্ষা দিবে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আমি ভিবিন্ন জনের কাছে ঋণী।

আজ ৩৯ তম বিসিএস এ স্বাস্থ্য ক্যাডারে গেজেটেড হলাম। আমার সেই রিক্সা চালক বাবার, ভ্যান চালক ছেলে আজ সরকারের ১ম শ্রেনীর গেজেটেড কর্মকর্তা।

আজ দেশের মানুষকে আমার অনেক কিছু দেবার সময় এসেছে। সে সুযোগ আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। সবার কাছে দোয়া চাই যেন এক জন ভালো মানবিক ডাক্তার হতে পারি আমি। দরিদ্রের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা আমার বাবা মায়ের জন্য দোয়া করবেন।

About Dolon khan

Check Also

যেভাবে নেবেন প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ প্রস্তুতি

দেশব্যাপী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। চাকরি প্রত্যাশি লাখ প্রার্থীর ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x

You cannot copy content of this page