Thursday , January 21 2021
Breaking News
Home / Exception / রেলওয়ে স্টেশন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েটাই মা–বাবার ভরসা

রেলওয়ে স্টেশন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েটাই মা–বাবার ভরসা

মেয়েটার নাম পরিনা। অর্থাৎ পরি নয়—মানুষ। এ রকম করেও তাঁর নামের অর্থ করা যায়। আসলে তাঁর পালক বাবা তাঁকে পড়ে (কুড়িয়ে) পেয়েছিলেন। এই ‘পড়ে পাওয়া’ শব্দের সঙ্গে মিল রেখে তাঁর ফুফু কাদো বেগম মেয়ের নাম রেখেছিলেন পরিনা। শুধুই ‘পরিনা’; তার আগে–পরে আর কিছুই নেই।

সেই পরিনা পারেন না এমন কোনো কাজ নেই। অনেক সময় ছেলেরা যা পারে না, পরিনা তা করে দেখান। যেমন অনেক ছেলেই বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখাশোনা করেন না। কেউ পাঠিয়ে দেন বৃদ্ধাশ্রমে। এই সমাজে পরিনা তাঁর পালক বাবা-মাকে দেখাশোনার জন্য বিয়েই করেননি। ভেবেছেন, যদি পরের ঘরে গিয়ে বাবা-মাকে দেখাশোনা করার সুযোগ না পান। তিনি ছাড়া তাঁর বাবা মায়ের যে আর কেউ নেই!

পরিনার বয়স এখন ২৯ বছর। ভেবেছেন, যত দিন বাবা-মা বেঁচে থাকবেন, তত দিন তাঁদের পাশে থাকবেন। তারপর টাকাপয়সা হলে একটা বৃদ্ধাশ্রম করবেন। সেখানে অন্য অসহায় বাবা-মায়ের সেবা করে জীবনটা কাটিয়ে দেবেন।

পরিনা যখন শিশু, তখন সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশনে কাঁদছিল। তখন তার বয়স ছিল প্রায় ১০ মাস। স্টেশনের কলার ব্যাপারী আব্দুল ওহাব নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। ‘বাচ্চা কার গো’—বলে হাঁকডাক দিলেন।

কেউ কোনো সাড়া দিলেন না। দূরে একজন নারী শুধু দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিলেন। তাঁর কাছে গিয়ে আব্দুল ওহাব বললেন, ‘বাচ্চাটা কি তোমার?’ মেয়েটি কোনো কথা বললেন না। আব্দুল ওহাব বলেন, ‘আমার কোনো ছেলেমেয়ে নেই। বাচ্চাটা আমি নিয়ে গেলাম। বাচ্চাটা যদি তোমার হয়, কোনো দিন মন চাইলে আমার বাড়িতে এসে দেখে যেয়ো।’ এই বলে ঠিকানা দিয়ে আসেন। কিন্তু ওই নারী কোনো দিন তাঁর বাড়িতে মেয়েকে দেখতে আসেননি।

পরিনা বড় হয়ে পালক বাবা-মায়ের কাছে এই গল্প শুনেছেন। পরিনার পালক মায়ের নাম সাহিদা বেগম। বাবার বয়স এখন প্রায় ৮৫ বছর। মায়েরও কাছাকাছি। বাড়ি নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায়। বাবা সান্তাহার স্টেশনে কলা বিক্রি করতে যেতেন। একটু বড় হলে পরিনাও বাবার সঙ্গে যেত।

পরিনার মনে আছে, কলা বিক্রি করে যে কয় টাকা লাভ হতো, সেই টাকা দিয়ে পরিনা বাজারে যা খেতে চাইত, বাবা তা–ই কিনে দিতেন। তারপর মেয়েকে ডালার ওপর বসিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। বাবার এই ভালোবাসার কথা পরিনা কিছুতেই ভুলতে পারেন না। বাবা–মায়ের এই ভালোবাসা ছাড়া পরিনার শৈশব জীবন খুবই দুর্বিষহ ছিল। খেলার সাথিদের সঙ্গে খেলতে গেলে তারা বলত, ‘তোর বাপ–মায়ের নাম নাই।

তোকে কুড়িয়ে এনেছে।’ এসব কারণে ছোটবেলায় তাঁর খেলার কোনো সাথি ছিল না। সে কারও সঙ্গে মিশতে পারত না। বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরেও সহপাঠীদের কাছ থেকে একই রকম কথা শুনতে শুনতে তাঁর মন সারাক্ষণ খারাপ থাকত। তাই কোনো সহপাঠী কোনো দিন তাঁর বন্ধু হয়নি। বিদ্যালয় তাঁর ভালো লাগত না।

এভাবে পরিনা জামালগঞ্জ ব্র্যাক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এবং নিজেদের গ্রামের নুনুজ কলিমিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০০৭ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর জামালগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর টাকার অভাবে আর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। তখন সংসারে অভাব। বাবা আর কলা বিক্রি করতে যেতে পারতেন না। মা মানুষের বাড়িতে গিয়ে চেয়েচিন্তে যা নিয়ে আসতেন, তা খেয়ে কোনোরকমে জীবন ধারণ করতেন। কোনো উপায় না দেখে ২০০৯ সালে মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকা বেতনে নাটোরে প্রাণ কোম্পানিতে কাজে যোগ দেন। এই চাকরি করতে করতেই উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দিঘাপতিয়া এমকে কলেজ থেকে ২০১৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজশাহীর নওহাটা ডিগ্রি কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। বর্তমানে তাঁর তৃতীয় বর্ষ চলছে।

২০১৮ সাল পর্যন্ত ওই কোম্পানিতেই কাজ করেন। এরপর রাজশাহী শহরের বিসিক এলাকায় একটি নতুন প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনে চাকরি পান। প্রাণে কাজ করার সময় সালেহা খাতুন নামের এক নারীর সঙ্গে তাঁর সখ্য হয়। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। তাঁর বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়ার নন্দনপুর গ্রামে। পরিনাকে আপন বোনের মতো ভালোবাসেন। পরিনার সঙ্গে তিনিও নতুন প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনে চাকরি নিয়েছিলেন। করোনাকালে দুজনেই চাকরি হারান।

এখন পরিনা সালেহার বাসাতেই থাকেন। দুজনেই চাকরি থাকাকালে কিছু সঞ্চয় করেছিলেন। এখন সেই সঞ্চয় থেকে মাসে ২ হাজার ৭০০ টাকা মুনাফা পান। তা থেকে দেড় হাজার টাকা পরিনা তাঁর বাবা–মায়ের জন্য পাঠান। আর তাঁরা দুজনে ১ হাজার ২০০ টাকায় মাস চালান। কাজ খুঁজছেন হন্যে হয়ে।

জীবনের এই লড়াইয়ের মধ্যেই পরিনা লেখালেখির অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর বেশ যোগাযোগ। ঢাকায় গেলে কবি নির্মলেন্দু গুণের বাসায় যান। পরিনার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৬। তিনি গানও লেখেন। গানের সংকলন—মনের কথা গানে গানে। কণ্ঠশিল্পী রিংকু তাঁর গান করেছেন। নিয়মিত একটি অনলাইন পত্রিকায় লেখেন। যদিও লেখালেখি থেকে এখনো তাঁর কোনো আয় হয় না।

নারী-পুরুষ নয়, তিনি নিজেকে মানুষ ভাবতে ভালোবাসেন। মানবতাবিরোধী যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এখন তাঁর খুব দুঃসময় যাচ্ছে। প্রায় নুনভাত খেয়ে থাকেন। গরুর মাংসের কেজি যখন ২৫০ টাকা ছিল, তখন আধা কেজি মাংস কিনেছেন। পেঁয়াজ–রসুনের দাম বেড়ে গেলে তা বাদ দিয়ে রান্না করেন। বাবা–মাকে বেশি টাকা পাঠাতে পারেন না। তাতেও তাঁর দুঃখ নেই। দুঃখ হচ্ছে, তিনি জানেন না, তাঁর বাবা–মা কে। কষ্ট হয়, হয়তো বাবা তাঁর পাশ দিয়েই হেঁটে যান আর মেয়েকে দেখেন অচেনা চোখে।

About khan

Check Also

কন্যা সন্তান জন্মের ৩৯ দিন পর পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন মা

ময়মনসিংহে এক ব্যতিক্রম ঘটনার জন্ম দিয়েছেন রীতা আক্তার ও আমিনুল ইসলাম দম্পতি। সাড়ে তিন বছরের ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page