Saturday , May 8 2021
Breaking News
Home / Education / বিসিএস পরীক্ষা : সিভিল সার্ভিস ও বাংলাদেশ

বিসিএস পরীক্ষা : সিভিল সার্ভিস ও বাংলাদেশ

ইদানীং বিসিএস পরীক্ষা একটি জোরালো আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। চাকরির সন্ধানে যুবসমাজ বিসিএস পরীক্ষার দিকে প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়েছে। আগে কি এ দেশে বিসিএস নামক কোনো পরীক্ষা ছিল না বা তার আগে সিএসএস, তারও আগে আইসিএস এমন কোনো কিছু? নিশ্চয়ই ছিল। একজন স্বদেশী আইসিএসকে তখন ভারতীয় মনে না করে ‘ইংরেজ’রূপে কল্পনা করা হতো। পাকিস্তান আমলে সিএসপিদের বলা হতো ‘প্রশাসনের রাজপুত্র।’ ব্রিটিশ শাসনামলে ব্যক্তিগত খাতে কোনো পুঁজির বিকাশ ঘটেনি। ক্যাপিটাল বা পুঁজি বলতে যা বোঝায় তা ছিল রাষ্ট্রীয় পুঁজি। ব্যবসায়-বাণিজ্য যা ছিল তা ছিল একান্তভাবে ইউরোপিয়ানদের হাতে। অতএব ব্যবসায়-বাণিজ্য নয় চাকরি এবং চাকরি মানে সরকারি চাকরি এবং তার দাম ছিল অনেক উঁচুতে। প্রবাদবাক্যের মতো উচ্চারিত হতো ‘চাকরি মানে ঘি-ভাত’। তবে চাকরির বাজারে ভারতীয়দের অবস্থান ছিল নিচের দিকে।

কর্মকর্তাদের মধ্যে ডেপুটি সেক্রেটারির ঊর্ধ্বে ভারতীয়দের খুঁজে পাওয়া যেত না। লিয়াকত আলী খান যখন ভারতবর্ষের অর্থমন্ত্রী তখন গোলাম মোহাম্মদ নামে একজন পাঞ্জাবি ছিলেন ডেপুটি সেক্রেটারি। পরবর্তীতে এই গোলাম মোহাম্মদ একসময় পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হয়েছিলেন। প্রশাসননির্ভর ব্রিটিশদের শাসন ভারতবর্ষের উৎপাদন ও উন্নয়নে কোনো উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। পূর্ববর্তী মোগল আমলের চেয়ে খাদ্য উৎপাদন তিন ভাগের এক ভাগ হ্রাস পায়। অত্যধিক করারোপের ফলে সাধারণ জনগণ চাষাবাদ ছেড়ে দেয়। ঢাকা, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার এক বিরাট জনগোষ্ঠী তাদের পেশা বদলিয়ে বয়নশিল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আজো তারা এ অঞ্চলে ‘জোলা’ নামে পরিচিত। চাষাবাদের অভাবে ঢাকার আশপাশে গভীর বন-জঙ্গলে ভরে যায়। তখন দিনদুপুরে এই এলাকায় বাঘের আওয়াজ শোনা যেত। খাদ্যের অভাবে বাংলা ও অন্যান্য প্রদেশে তখন কয়েকবার দুর্ভিক্ষ হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল আমেরিকার তুলনায় ০.৫৫ ভাগ অথচ আমেরিকার জনসংখ্যা ছিল ভারতের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। ভারতের কোস্টাল বেল্ট ছিল তিন হাজার ৮০০ মাইল কিন্তু মৎস্য উৎপাদন ছিল বছরে মাথাপিছু ৫০০ গ্রাম। স্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকালে যে চিত্র পাওয়া যায় তা একেবারে ভয়াবহ। ভারতবর্ষে যে পরিমাণ কুষ্ঠরোগী ছিল তার সংখ্যা ছিল সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। প্রতিদিন শিশু জন্ম নিতো ৩৮ হাজার তার চার ভাগের এক ভাগ মারা যেত পাঁচ বছর বয়সের আগেই।

Ad by Valueimpression
যে ইংল্যান্ডে ‘শিল্পবিপ্লব’ হয়েছিল তারা ভারতে উল্লেখযোগ্য কোনো শিল্পকারখানা স্থাপন করেনি। রেললাইন স্থাপন করা হয়েছিল দুটি কারণে- সিপাহী বিপ্লবের ফলে তারা দেখতে পেলো, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে তাদের অনেক সেনাকে মরতে হয়েছে আর একজন বিদেশী লেখকের ভাষায় ইংল্যান্ডে উৎপাদিত লোহা তারা বিক্রি করেছে তাদের উপনিবেশগুলোতে। যত্রতত্র পরিকল্পনাবিহীন রেললাইন স্থাপনের ফলে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের ভাষায়- ভারতে ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড ও বন্যা স্থায়িত্ব লাভ করে। ব্রিটিশের ১৯০ বছরের শাসনামলে নিরক্ষর লোক ছিল ৯০ ভাগ। মাথাপিছু ইনকাম ছিল ১৮০ টাকা মাত্র- যা বিশ্বমানের একবারে নিচে। তখন ইন্ডিয়ার সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে বলা হতো যে, তারা Neither Indian, nor civil, nor service তারা ইন্ডিয়ান নয়। তাদের বেশির ভাগ কর্মকর্তা ইংরেজ ছিলেন, ভারতীয় নয়। তারা মোটেও সিভিল নয়, তাদের অনেকেই ছিলেন অত্যন্ত উদ্ধত স্বভাবের, এদের মধ্যে সার্ভিসের লেশমাত্র ছিল না, তারা সেবা করতেন না, প্রজাদের শাসন করতেন। ভারতীয়দের মধ্যে কে কখন আইসিএস হয়েছিলেন এটা আজ একবারে নগণ্য ব্যাপার। ভারত থেকে অবসর গ্রহণ করে ইংরেজ আইসিএস অফিসাররা যখন স্বদেশে ফিরে যেত তখন তাদের ‘নবাব’ বলে সম্বোধন করা হতো।

একদা যে কারণে অটোমান সাম্র্রাজ্যের পতন ঘটেছিল একই কারণে ব্রিটিশ সাম্র্রাজ্যেরও পতন ঘটল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- গান্ধীজির আন্দোলনের ফলে কি আপনাদের ভারত ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে? তখন অ্যাটলি উত্তর দিয়েছিলেন- মোটেই নয়। ভারতবর্ষে আমাদের উপনিবেশ ধরে রাখতে যে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন, তাদের বেতন-ভাতা দেয়ার ক্ষমতা এখন আর আমাদের নেই। বস্তুত গান্ধীজির আন্দোলনের জন্য নয়- হিটলারের বিমানবাহিনীর প্রলয়ঙ্করী বোমার আঘাতে ব্রিটিশরাই সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে ব্রিটিশকে তার কলোনিগুলো ছেড়ে দেশে ফিরে যেতে হলো।

সুযোগ্য আমলা, বাঘা বাঘা আইসিএস, মাথাভারী প্রশাসন ব্রিটিশদের আসল বিপদের সময়ে যথাযথ কোনো কাজে লাগল না। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা সমভাবে প্রযোজ্য।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে ‘সমাজতন্ত্র’ নামক একটি শূন্যগর্ভ মতাদর্শ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অর্থনীতিতে যে দৈন্যদশার সৃষ্টি হয় তার পরিসমাপ্তি ঘটে একটি করুণ বেদনার্ত পরিণতির মাধ্যমে। একজন বিদেশী লেখকের ভাষায়- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে প্রাণ দিতে হলো একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য নয়, একটি স্বাধীন জাতি সৃষ্টির জন্য নয়- তার দেশী-বিদেশী পরমর্শদাতাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঔদ্ধত্যের কারণে। অপর দিকে সেই আওয়ামী লীগও আজ সমাজতন্ত্রের কথা বলে না। পৃথিবীতে সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন স্বপ্নেই রয়ে গেল। সমাজতন্ত্র প্রসঙ্গে ড. আকবর আলি খানের একটি বক্তব্য এখানে অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য : ‘পুঁজিবাদ হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে মানুষ শোষণ করে মানুষকে। আর সমাজতন্ত্র হচ্ছে তার সম্পূর্ণ উল্টো। কথাটি উল্টালেও দাঁড়ায় মানুষ শোষণ করে মানুষকে’। সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের নির্যাস একই। তখন লক্ষ্য ছিল বড় বড় প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত করে এর মুনাফা দিয়ে দরিদ্রদের জন্য জনকল্যাণকর অর্থের জোগান দেয়া হবে। চীনসহ পৃথিবীর সর্বত্র এই ব্যবস্থা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। একজন মার্কিন সাংবাদিক বলেছিলেন- সরকারের কাজ হচ্ছে সরকারকে ব্যবসায়-বাণিজ্যের বাইরে রাখা যদি না ব্যবসায়ীরা সরকারের সাহায্যের প্রয়োজন বোধ করেন। এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। ’৭২-’৭৩ এ আমাদের বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। আর হালআমলের বাজেট হলো ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিরাট ব্যবধান সৃষ্টিতে অর্থের জোগান এসেছে মূলত বেসরকারি খাত থেকে। আওয়ামী লীগের ’৯৬-২০০১ সালের সরকারের আমলে এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, সেবা খাত থেকে আয় ছিল ৪৭.২ শতাংশ। এ থেকে বোঝা যায়, আমাদের দেশে আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যক্তিরা অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ’৬২টির আগে উন্নয়ন বাজেট বলে কোনো বাজেট ছিল না। দক্ষতা ও উদ্যম অর্থনৈতিক প্রসারের পথ খুলে দিয়েছে।

২০১১ সালের একেবারে শেষের দিকে এসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা এক ধরনের অস্বস্থিতে ভুগতে থাকেন। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালে তখনকার রাজনৈতিক কারণে এই অস্বস্তি বিরাট আকার ধারণ করে। সরকার এই সময়ে বিষয়টিকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে না করলেও ২০১৯ এ একজন ব্যবসায়ী অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর বুঝতে পারলেন, অর্থনীতির এসএমই খাত স্থবির হয়ে গেছে। তিনি এই খাতকে পতিত অবস্থান থেকে মুক্ত করতে চাইলেন। অর্থনীতির প্রাণ হলো, এসএমই। এই খাত সচল থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল ও শক্তিশালী থাকে। পাকিস্তান আমলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যে একেবারে শূন্যের কোঠায় এসে পৌঁছেছিল, তার মূল কারণ ছিল ওই সময়ে এসএমই খাত ছিল একবারেই দুর্বল। অর্থনীতির আরো একটি দিক আছে; ড. আকবর আলি খানের তথ্য অনুযায়ী ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তার উন্নয়ন প্রতিবেদনে (১৯৯৮-৯৯) উল্লেখ করে যে, যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য উৎপাদনে যত শ্রমিক নিয়োজিত তার চেয়ে অনেক বেশি লোক কাজ করছে জ্ঞানের উৎপাদন ও বিতরণে।

এ শতাব্দীর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিল তিন লাখেরও কম। আজকে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এক কোটি ৫৫ লাখেরও বেশি ছাত্রছাত্রী। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র তিনটি এবং ময়মনসিংহ ও বুয়েটকে নিয়ে মোট পাঁচটি। বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছিল পাকিস্তানের শেষের দিকে মাত্র চারটি। এখন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ মিলে দেশ ও বিদেশে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী অধ্যয়নরত। প্রাচীনযুগ, মধ্যযুগ ও বর্তমানের শিক্ষা এক নয়। বিদগ্ধজনের মতে, ওই সময়ের শিক্ষার সাথে অর্থের সম্পর্ক ছিল দুর্বল। তখন শিক্ষকদের নির্ষ্কমা মনে করা হতো। আর আজকাল উপযুক্ত শিক্ষকই পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্বপরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে।

একই লেখকের মতে, আশির দশকের প্রথম দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০০টির বড় কোম্পানির নির্বাহীর গড় শ্রমিকদের চেয়ে ৩৫ গুণ বেশি বেতন পেতেন। একই দশকের শেষের দিকে প্রধান নির্বাহীরা সাধারণ শ্রমিকদের চেয়ে ১৫৭ গুণ বেশি বেতন পেতেন। বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর বেতন-ভাতা ও বোনাস মিলিয়ে মাসে ১৫ থেকে ১৭ লাখ বা তারও বেশি টাকা উপার্জন করেন। একই সময়ে একজন সাধারণ পিয়ন, চাপরাশি, ঝাড়ুদার, কোনো সার্ভিস প্রোভাইডারের মাধ্যমে বেতন পান ছয় থেকে আট হাজার টাকা। বেসরকারি হাসপাতালের কয়েকটিতে বেশ কয়েকজন ডাক্তারের বেতন মাসে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। আয়া বা ক্লিনারের মাসিক বেতন ছয় থেকে আট হাজার টাকা। বৈষম্যটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি। এই অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, সরকারি প্রশাসন, স্বায়ত্ত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সব চাকরিজীবী সবাই ফুঁসতে থাকেন। বিদ্যমান পে-স্কেলে রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা অনেক কম। তখনই একটি নতুন পে-স্কেল ঘোষণার চিন্তাভাবনা চলতে থাকে। বহু বছর আগে এক হাজার ১৫০ টাকা যেখানে প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন সর্বমোট ছিল নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর সেটা গিয়ে দাঁড়ায় বেতন-ভাতাসহ ৫২ হাজার টাকায়।

অপর দিকে, প্রাইভেট সেক্টরে ২০০৭ সালের পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের শিথিলতা বিরাজ করতে থাকে। প্রথমে তা অনুভূত হয় জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে। মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, কুয়েত বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করতে থাকে। এখন তা একেবারেই বন্ধ রয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ব্রুনাই, মালদ্বীপ, লিবিয়া, ইরাক, জর্দান, মরিশাস, লেবানন প্রভৃতি দেশে স্বল্প পরিসরে জনশক্তি রফতানি অব্যাহত থাকলেও বর্তমানে যাওয়া তো দূরের কথা বরং উল্টো এসব দেশ থেকে অভিবাসী শ্রমিকরা ফিরে আসছেন। ২০১২ সালের দিকে নিত্য হরতাল, বন্ধ এবং শাটডাউনের মতো ঘটনায় সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে গার্মেন্ট ও বস্ত্র-ব্যবসায়ীরা বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হন। এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবে এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছিল যে দেশটি মিসরীয় তুলার সমমানের তুলা উৎপাদন করে এবং বস্ত্র রফতানি করে। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের টেক্সটাইল মিলগুলো, গার্মেন্ট শিল্প ও বস্ত্র ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তার দিকে পা বাড়ান। পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য ওই দেশটির সাথে প্রায় বন্ধ ছিল।

২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এসএমই খাতের অর্থনীতি নন- ভাইব্রেন্ট অবস্থায় চলতে থাকলে বহু গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে যায় অথবা বিক্রির জন্য চেষ্টা চলতে থাকে। এরই সাথে ব্যাংকের দেনাও বাড়তে থাকে। এবার শুধু এসএমই খাত নয়- করোনাভাইরাসের আগমনের বহু আগেই বড় বড় করপোরেট হাউজগুলো অর্থনৈতিক মন্দাজনিত কারণে অচল হয়ে পড়ে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। দু-একটি বিদেশী কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে তাদের ব্যবসায়-বাণিজ্য গুটিয়ে ফেলে। রিয়েল অ্যাস্টেট ব্যবসা মোটামুটি বন্ধ হয়ে যায়। রাজধানীর ভাটারার নতুন বাজার এলাকার একজন ভিক্ষুকের কথায় ‘সাহেবরা আগের মতো পয়সাকড়ি দেয় না, হেগোরও আয়-ইনকাম কইম্যা গেছে।’ একজন ভিক্ষুক তার দেশের অর্থনীতির যথার্থ চিত্র বর্ণনা করল তার নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায়। এমতাবস্থায় সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্রমবর্ধমান ক্রোধের উপশমের জন্য সরকার নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করে আর চাকরির সন্ধানে উৎকণ্ঠিত যুবসমাজ এই পে-স্কেল দেখে বগল বাজাতে শুরু করে দেয়।

তখন থেকেই অধিকসংখ্যক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ তাদের চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রযুক্তিজ্ঞান ও কৃষিবিদ্যাকে দূরে ঠেলে ফেলে বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার অতি স্বাভাবিকভাবে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন- এমন হলে বিশেষায়িত খাতগুলোর কী হবে? বিশেষায়িত খাতগুলো যেমন আছে, তেমনি পড়ে থাকবে না। গবেষণার ক্ষেত্রে নিত্যনতুন অভিজিতরা দুনিয়া কাঁপানো গবেষণা দিয়ে সাড়া জাগিয়ে তুলবেন। বিশ্ববাজারে গবেষণার চাহিদা ব্যাপক এবং বিস্তৃত। অন্যদিকে যারা বিশেষায়িত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এখন ক্যাডার কর্মকর্তা হতে চাচ্ছেন; দু-চার বছর চাকরি করার পর তাদের সেই অর্জিত বিদ্যাও তারা ভুলে যাবেন। তখন তারা সবাই এসআর ওসমানী হয়ে পড়বেন বা ‘ব্রাহ্ম বুদ্ধিজীবী’ হবেন। আমলার চেয়ারে বসে জোর করেও বড় ডাক্তার বা বড় ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যায় না। আলী ইমাম মজুমদারের মতো প্রফেসর আবদুস সালামও কথাটিকে অন্যভাবে ঘুরিয়ে বলেছেন; তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যায় যদি নতুন গবেষণা না হয় তাহলে বিজ্ঞান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কালোদিন ঘনিয়ে আসবে। মানবজাতির এই পৃথিবীতে আগমনের পর থেকে তার টিকে থাকার জন্য গবেষণা চলছে এবং শেষ দিন পর্যন্ত চলবে। গবেষণায় দুর্দিন আসার সম্ভাবনা নেই।

সে যাই হোক; ১৯০ বছরে ব্রিটিশ যে অর্থনীতির পরিবর্তন আনতে পারেনি; ২৩ বছরে পাকিস্তানিরা যা করতে পারেনি- তা সম্ভব হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এবং এটা তারাই করেছিল। মার্কিন ও জাপানিদের দৃষ্টিতে বড় অর্থনীতি সৃষ্টির মেরুদণ্ড এসএমই খাত। লালফিতার এই দেশে জনগণ কর্ম ও প্রযুক্তির প্রেরণায় নবউদ্যমে জেগে ওঠে। সরকারি চাকরির প্রতি সাম্প্রতিক এই ঝোঁক সৃষ্টির অন্য একটি কারণ রয়েছে। হালআমলে বেসরকারি চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। দুর্যোগ দুর্বিপাকে, বন্যা-বাদলে, মহামারীতে তার ওপর প্রভাব পড়ে। এর কোনোটাই সরকারি চাকরির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে না। সিডর, আমফান, আইলা, তাকে কাত করতে পারে না।

ভারতীয় প্রাচীন অর্থনীতিবিদ চানক্যের মতে, মাছ যখন পানি খায়, এটা যেমন দেখা যায় না, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যখন ঘুষ খায় এটাও তেমনি দেখা যায় না। অতএব, বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পেলে তারপর ৩০ থেকে ৩৫ বছর নিশ্চিন্তে প্রজাতন্ত্রের ‘প্রজা’দের ঘাড়ে চেপে এই দীর্ঘ সময়টা পার করা যাবে। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করার পরও সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত থাকবে। অবিভক্ত বাংলার গভর্নর হাবার্ট থেকে পাকিস্তানের আজিজ আহমেদ এবং হালআমলের কুড়িগ্রামের ডিসি, এরা সবাই সাধারণ মানুষের আবেগ অনুভূতির সাথে তাদের একাত্ম হওয়াটাকে মর্যাদাহানিকর বলে মনে করেন। এত বড় উচ্চপদে আসীন কর্মকর্তাদের মানসিক হীনম্মন্যতা, দার্শনিক নৈরাজা ও অদূরদর্শিতা যে কত বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে তা দেখার জন্য আজিজ আহমেদও বেঁচে নেই- সেই পাকিস্তানও টিকে নেই। ব্রিটিশদের মতো বাঘা বাঘা সিএসপি সেই পাকিস্তান টিকিয়ে রাখতে পারেনি। বিসিএস নিয়ে আলী ইমাম মজুমদারের আশঙ্কার জবাবে বলতে হয়, প্রতি বছর যে বিপুলসংখ্যক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী যুবক বেরিয়ে আসছে তাদের সবাইকে কি সরকারি খাতে সামাল দেয়া সম্ভব হবে?

ইউরোপ, আমেরিকা, দূরপ্রাচ্যে কারো পক্ষেই সম্ভব হয়নি, বাংলাদেশের পক্ষেও সম্ভব নয়। পথ আমাদের খোলা রয়েছে। সে হিসাব-নিকাশ সামান্য হলেও এই নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন উচ্চপদস্থ অবসরপ্রাপ্ত আমলা প্রশাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে যে বিশেষ দিকটা তুলে ধরেছেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিশেষে বলতে হয় ‘এখনি অন্ধ, বন্ধ করো না পাখা’, এবার মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যুবসমাজ যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার পরিচয় দেখিয়েছে তাও ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তারা শুধু ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেনি- লাশের দাফনেরও ব্যবস্থা করেছে। রোগাক্রান্ত অসুস্থ মানুষগুলোকে নিয়ে ডাক্তার, নার্স, জেলা প্রশাসন, সশস্ত্রবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার বাহিনী যে পরিশ্রমটা করেছে এসব কিছু দেখে হয়তো একসময় গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস মন্তব্য করছিল- দুর্যোগ, দুর্বিপাকে বাংলার মানুষের মধ্যে এক অসীম সাহস ভর করে যা শুধু দূরপ্রাচ্যের মানুষের সাথে তুলনা করা যায়’। দুঃখ হয় এটা ’৭৪-এ সম্ভব হলো না কেন? তখন খাদ্যের অভাব ছিল, এ কথা সত্য নয়। ’৭৩-এর চেয়ে ’৭৪-এ খাদ্য মজুদ বেশি ছিল। (সূত্র : অমর্ত্য সেন)

সেই বাংলাদেশ আজ আর নেই। এখন আর ‘ভুক নাগছে মা, একনা ভাত দাও’ বলে দ্বারে দ্বারে কেউ কড়াঘাত করে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির জ্বলন্ত জাগ্রত জীবন্ত ইতিহাস। তিনি চেয়েছিলেন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখতে। মূসা (মরহুম এবিএম মূসা) বলেছিলেন, আমার দেশ গরিব থাকবে না।’ তাদের বলেছি; একটি দেশ ধনী হওয়ার জন্য প্রয়োজন দেশটি হতে হবে মুসলমানের, তাদের শাসককে হতে হবে শেখ। বাংলাদেশের তা আছে। অতএব বাংলাদেশ গরিব থাকবে না।’ স্পষ্টত তিনি মধ্যপ্রাচ্যের তখনকার সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে এ কথাগুলো বলেছিলেন। বড় দুঃখ নিয়ে তিনি এ দুনিয়া ত্যাগ করেছেন। একদা মানবজাতির সব পাপ, অন্যায়, দুঃখ, কষ্টকে কাঁধে নিয়ে ‘যিশু ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন’, তেমনি এ জাতির সব অন্যায় অপবাদ, অপরাধের দায়ভার নিজের কাঁধে নিয়ে প্রাণ দিয়ে গেলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আজ জাতীয় জীবনের সব আবর্জনা, জঞ্জাল, বদনাম ঘুচিয়ে এগিয়ে যেতে চায় বাংলাদেশ। ফিরে এসো হে বন্ধু, হে বীর। তোমার মতো একজন নেতার সন্ধানে নিরবধিকাল এ দেশের মানুষ চেয়ে থাকবে সবুজ বাংলার পথে-প্রান্তরে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও রাজনীতিক

About khan

Check Also

টিউশন না পড়েই, পুরানো বই পাঠ করে শ্রমিকের মেয়ে হয়ে গেল বোর্ড টপার, ছুঁয়ে দেখেনি স্মার্ট ফোন

ফলাফল বেরল উত্তরপ্রদেশ (Uttar Pradesh) বোর্ডের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার। শ্রমিক পিতা অঙ্গদ যাদব এবং গৃহকর্মী ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *