Thursday , April 22 2021
Breaking News
Home / Education / আদর্শ মাস্টারমশাই, বিনা পারিশ্রমিকে পড়ানোই নয়, পেনশনের টাকায় বই-খাতাও কিনে দেন

আদর্শ মাস্টারমশাই, বিনা পারিশ্রমিকে পড়ানোই নয়, পেনশনের টাকায় বই-খাতাও কিনে দেন

পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের উত্তর রামনগরের অশীতিপর শিক্ষক সুজিত চট্টোপাধ্যায়ের ‘সদাই ফকিরের পাঠশালায়’ এখনও রমরমাট তিনশোর জনজাতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় পড়ুয়া নিয়ে । দক্ষিনা বছরে দু টাকা, যা তিনি পড়ুয়াদের জন্যই খরচা করেন। তিনি মাধ্যমিক স্তরে বাংলা, ইংরেজি, ভূগোল, ইতিহাস এবং উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরে বাংলা পড়ান ও সঙ্গে গত পাঁচ বছর ধরে সাহায্য করেন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের।

বছরে এক বার থ্যালাসেমিয়া নির্ণায়ক শিবিরও করেন। মাস্টারমশাইয়ের নাম শুনলে জোড়হাত মাথায় ঠেকান বহু গ্রামের বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীরা ছাড়াও রয়েছেন, রয়েছেন বহু অভিভাবকও। পাঠশালায় পড়াশোনা শুরু হয় সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায়। হয় ‘রোল কল’। দু’দিন কোনও পড়ুয়া না অনুপস্থিত হলেই খোঁজ নিতে বেরোন এই শিক্ষক।

দাদু- মেয়ে-নাতি— তিন প্রজন্ম তাঁর কাছে পড়েছে এমন নজিরও রয়েছে। সুজিতবাবু শুধু বলেন, ‘‘সবাইকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসা শিক্ষকের দায়িত্ব। তা পুঁথিগত হোক, বা সামাজিক। দায়িত্ব পালন না করলে নিজেকে শিক্ষক বলব কী ভাবে!”

১৯৬৫ সালে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু । স্কুল ছুটির পরে পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের ‘বিশেষ ক্লাস’ নিতেন। স্কুল জীবনের শেষে স্থানীয় পরিবারগুলির শিশু ও কিশোরদের স্কুলমুখী করার জন্য উৎসাহ প্রদান করেন। ২০০৪ বাড়িতেই শুরু করেন পিছিয়ে পড়া পড়ুয়াদের পড়ানো ও পেনশনের টাকার একাংশ খরচ করে পড়ুয়াদের বই-খাতা কিনে দেন।

প্রথম দিকে বিনা পারিশ্রমিকেই পড়াতেন। পড়ুয়াদের প্রণামই ছিল গুরুদক্ষিণা। পরে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের সাহায্যের জন্য বছরে এক টাকা ‘দক্ষিণা’ নেওয়া শুরু করেন। হাসিমুখে বৃদ্ধ শিক্ষক বলেন, ‘‘বাজার আগুন। এখন তাই দক্ষিণা বেড়ে হয়েছে দু’টাকা।’’ বছর খানেক আগে এক থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ছাত্রের ক্যানসারও ধরা পড়েছে। প্রতি মাসে তার কলকাতা যাতায়াতের জন্যও সাহায্য করেন ‘মাস্টারমশাই’।

ছেলে সরকারি কর্মী, মেয়ে শিক্ষিকা। বাড়িতে আছেন স্ত্রী ও অন্য ভাইদের যৌথ পরিবার। স্ত্রী মীরা চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ছাত্র-ছাত্রী করেই জীবন কেটে গেল ওঁর। কী করে সংসার চলে, খেয়াল করেননি। ওঁকে অনেক বার বলেছি, ‘একটু বেশি টাকাও তো নিতে পার’। জবাব পেয়েছি, ‘তা হলে আর শিক্ষক হলাম কিসের?’ আর কথা বাড়াইনি।’’

এ বছর ‘পাঠশালা’র পড়ুয়াদের মধ্যে মাধ্যমিকে ৫১ জন ও উচ্চ মাধ্যমিকে ১১৬ জন পরীক্ষা দিয়েছিল। অনেকেই ৬০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ আউশগ্রামের দোলচাঁদা খাতুন, মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হেঁদেগোড়ার মাম্পি বিশ্বাসদের কথায়, “পড়ার পাশাপাশি, মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে সমাজের পাশে দাঁড়াতেও শিখছি।’’

ভুঁইরা গ্রামের যমজ বোন কৃষ্ণপ্রিয়া ও বিষ্ণুপ্রিয়া মেটে গুসকরা কলেজে পড়ছেন। তাঁরা বলেন, “জীবনে মাস্টারমশাইয়ের স্নেহস্পর্শ না পেলে পড়াশোনা তো দূর, জঙ্গলে কাঠ কুড়িয়ে হয়তো জীবন কাটত।’’ মোট কথা তিনি নিরক্ষীয় অঞ্চলে বনস্পতির ছায়ার মতন সকল পড়ুয়াদের ঢেকে রেখেছেন শিক্ষার স্পর্শে।

About khan

Check Also

ফজরের নামাজের পর কোরআন তেলাওয়াত করে মেডিকেলের পড়া শুরু করতেন মুনমুন

এমবিবিএস ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন মিশরী মুনমুন। তিনি পাবনা মেডিকেল কলেজ ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *